ব্যক্তিগতভাবে আমি কথাসাহিত্যিক হামিম কামালের লেখার দারুণ ভক্ত। তিনি যখন লেখেন, তখন সেটাকে কোনোভাবেই সাধারণ লেখার কাতারে ফেলা যায় না। তাঁর লেখার সবচেয়ে সুন্দর ও স্বতন্ত্র দিকটি হলো—প্রতিটি বাক্যজুড়েই যেন থাকে একটি আস্ত ক্যানভাস। একটি ক্যানভাস শেষ হতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আরেকটি নতুন ক্যানভাস। পড়ার সময় শব্দজুড়ে এই বিচরণের ঘোর পাঠকমস্তিষ্কে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়।
এই জাদুমন্ত্র হামিম কামাল কোথায় শিখেছেন, তা আমার জানা নেই। তবে তাঁর এই শব্দজাদুতে প্রথম মুগ্ধ হয়েছিলাম ২০১৮ সালে প্রকাশিত “কারখানার বাঁশি” উপন্যাসটি পড়ে। ঠিক দুই বছর পর প্রকাশিত নতুন উপন্যাস “জাদুকরী ভ্রম”-এ হামিম কামাল আবারও তাঁর সেই জাদুর বাক্স খুলে বসেছেন। নামের প্রতি সুবিচার করে উপন্যাসটি আক্ষরিক অর্থেই যেন পাঠকের জন্য এক ‘জাদুকরী ভ্রম’!
লেখকের কলমের আরেকটি চমৎকার বিষয় হলো ‘মেদহীন উপমা’। কোনো বাড়তি বা অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি কেবল একটি ছোট উপমা দিয়ে পুরো একটি চিত্রকল্প পাঠকের মস্তিষ্কে গেঁথে দিতে পারেন। যেমন, ভালোবাসার মানুষটি যখন উপন্যাসের চরিত্র ময়ূখের কাছ থেকে দূরে সরে গেল, তখন লেখক সেই ঘটনাটিকে বর্ণনা করেছেন ঠিক এভাবে—
“হঠাৎ নিজেকে ভীষণ রকম ধর্মীয় অনুশাসনে বেঁধে ফেলল। আমি কেবল তার চোখ দেখতে পেতাম।”
ব্যথিত ময়ূখ প্রশ্ন রাখে—এই অনুশাসনগুলো কি আদৌ বুদ্ধিদীপ্ত? কিন্তু কোনো উত্তর আসে না। প্রাত্যহিক জীবনে আমরা যেমন অসংখ্য অবুঝ প্রশ্ন এড়িয়ে যাই, ময়ূখের ভালোবাসার মানুষটিও ঠিক সেভাবেই এড়িয়ে যায়।
উপমা ব্যবহারে হামিম কামাল পরতে পরতে নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ছোট বাচ্চাদের দেখলে আমরা স্বভাবতই প্রগলভ হয়ে উঠি, তাদের অর্থহীন খেলাধুলা আমাদের আনন্দে উদ্বেলিত করে। এই সাধারণ অনুভূতিটিকে লেখক ধরেছেন অসাধারণ এক ভাষায়—
“আনন্দের একটা ফুলকি আমার চোখে পড়ল। ছোট্ট একটি মেয়ে… সে কী দৌড়ঝাঁপ তার।”
মানুষের বিচার প্রক্রিয়া আর বন্যদের বিচারিক ক্ষমতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন, “বন্যরা মানুষের আদালত ব্যবহার করে না, করে প্রকৃতির আদালত।” মানুষ সবসময়ই নিজের প্রয়োজনে বন ও বন্যদের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছে, যার বিনিময়ে প্রকৃতিও কখনো ছেড়ে কথা বলেনি। প্রকৃতির প্রতিশোধপরায়ণতা কতটা দীর্ঘ ও স্থায়ী হতে পারে, তার ক্যানভাস এঁকেছেন দারুণ এক উপসংহারে—“পিতা দণ্ডিত না হয়ে সন্তান দণ্ডিত হয়।”
এমন আরও অসংখ্য চমৎকার উপমা ছড়িয়ে আছে বইয়ের পাতায়। যেমন: “মেঘেদের গর্জন যেন দুইদল ফেরেশতার যুদ্ধ!” অথবা তারার সাথে মানুষের যোগসূত্রের নতুন এক ভাবনা—“আকাশের তারারও শেষ আছে, মানুষের দাবির কোনো শেষ নেই।” এমনকি গানের কথায় যে পাকা ধানের ঘ্রাণ পাওয়া যেতে পারে, তা-ও এই বইয়ের কল্যাণে জানা যায়!
“জাদুকরী ভ্রম”-এ আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে লেখকের ‘ডিটেইলিং’ বা নিখুঁত বিবরণ। যেন সুনিপুণ কোনো চিত্রশিল্পী তিনি, যার তুলির একটি আঁচড়ও বাদ যায় না। পড়ার সময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাগরতীরের নির্জন বিকেলের শহর; কিংবা ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ছোট ছোট দৃশ্যে দেখতে পাই কীভাবে ময়ূখ একটি চাদরকে কখনো বালিশ, কখনো বিছানা, কখনো দড়ি কিংবা মাথার পট্টি বানাচ্ছে! লেখক অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় এঁকে যান একটি গ্রাম, বাতাসে দোল খাওয়া ধানক্ষেত, ধানক্ষেতের মাঝে জাদুর মতো এক কুঁড়েঘর আর সেখানে জ্বলে ওঠা সোনালি আগুন। সবকিছু যেন সিনেমার মতো চোখের সামনে ভিজ্যুয়ালাইজ হতে থাকে। কখনো রক্ত জমাট বাঁধা ঠান্ডার বর্ণনা পাঠকের চোয়াল কাঁপিয়ে দেয়, আবার কখনো অশরীরী ছায়া ঘিরে ধরলে পাঠকও ময়ূখের মতোই নিশ্চল হয়ে যান—ছুটে পালানোর কোনো পথ থাকে না!
একটি মূল গল্পের সাথে আরও অসংখ্য উপগল্পের সুনিপুণ বুননে তৈরি হয়েছে এই উপন্যাসের প্লট। নলদমন্তী গ্রামে ঘুরতে গিয়ে ময়ূখ এবং অরবিন্দের বরাত দিয়ে এক বৃদ্ধের গল্পে জেগে ওঠে—কীভাবে দেবযানী একদিন আসমানী হলো, আসমানীর ছেলে কাহের কীভাবে তুচ্ছ অবস্থা থেকে প্রত্যুৎপন্নমতি হয়ে উঠল এবং একসময় জমিদার বনে গেল! বৃদ্ধের কাছে যে গল্পের সূচনা হয়েছিল, রফিকের কাছে এসে প্রতি রাতে সেই গল্প ডালপালা ছড়িয়ে যেন এক জীবন্ত মহীরুহে পরিণত হয়। গল্পের প্রতিটি চরিত্রই হয়ে ওঠে রক্তমাংসের মানুষ। এটাই আসলে হামিম কামালের জাদু!
শব্দচয়ন এবং চরিত্র বা প্রকৃতির নামকরণে এই যুগে হামিম কামালকে অদ্বিতীয়ই বলতে হয়। তা না হলে নদীর নাম ‘দেবীজঙ্ঘা’ কে দিতে পারে? কে-ই বা ভাবতে পারে গাঁয়ের নাম হতে পারে ‘নলদমন্তী’ কিংবা ‘পিয়াই’!
উপন্যাসটি যত এগিয়েছে, পাজলের মতো প্রতিটি অংশ একে অপরের সাথে মিলে গিয়ে শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতাবান বনাম নিপীড়িতের এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ে। পিয়াই গ্রামে মিনা আর মজনুনের সাথে পরিচয়ের পর, মজনুনের আদর্শিক শিক্ষক মহেনের কাছে জানা যায় কাহেরের অত্যাচারী হয়ে ওঠার পেছনের গল্প। জমে ওঠে মজনুন বনাম কাহের সৌদ-এর চূড়ান্ত দ্বন্দ্ব! এই জাদুকরী ভ্রমে ময়ূখ ও অরবিন্দের সাথে ক্যারিশম্যাটিক পথচলায় যেকোনো পাঠককেই আমি আমন্ত্রণ জানাব।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান প্রকাশনা জগতে সস্তা জনপ্রিয়তার স্রোতে কিংবা ‘মিনি হুমায়ূন আহমেদ’ হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতার যুগে হামিম কামালের মতো ঔপন্যাসিক বাংলা সাহিত্যে সত্যিকার অর্থেই এক আশার আলো। ‘কারখানার বাঁশি’র সুর কিংবা ‘জাদুকরী ভ্রম’-এর মতো মোহময় সাহিত্য তাঁর কলম থেকে আরও বেশি করে বেরিয়ে আসুক—সেই প্রত্যাশাই করি।
লেখক হামিম কামালের জন্য রইল অফুরন্ত ভালোবাসা ও শুভকামনা।
আমি