মূল লেখায় যান
রাইসুল সোহান
সব লেখা

আরিমাতানো

বই

মানুষ মারা যাওয়ার পর কি তার পুরো জীবনের স্মৃতিকথা নিজের মুখে বলতে পারে? এটি সম্ভবত মানবমনের অন্যতম প্রাচীন ও গভীর এক ফ্যান্টাসি। মৃত্যুর পর কেবলই নিকষ অন্ধকার—এমনটাই আমাদের চিরচেনা ধারণা। আর ঠিক সেই অন্ধকারের বুক চিড়েই যেন ‘আরিমাতানো’র পুরো জীবনটাকে শব্দের তুলিতে আঁকতে চেয়েছেন লেখক মাহবুব ময়ুখ রিশাদ। আমরা যেমন মাঝেমাঝেই ভাবি—‘ইশ! যদি অমুক মানুষটার মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকে দেখে আসতে পারতাম তার জীবনটা কেমন!’—লেখক ঠিক এই কাজটিই করেছেন তাঁর “আরিমাতানো” উপন্যাসে। এখানে তিনি চার-পাঁচজন ভিন্ন মানুষের জীবনের ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন, বলতে চেয়েছেন তাদের অব্যক্ত গল্পগুলো। আর এই গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রধান চরিত্র—আরিমাতানো।

উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে এক কথায় অনবদ্য।

“ফুরিয়ে যাচ্ছিল সপ্তাহ শেষের সন্ধ্যাটা। ওদিকে আরিমাতানোর গল্পটা আপনাদের বলার জন্য আমার তর সইছিল না।”

একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, সপ্তাহান্তের এক নির্ভার সন্ধ্যায় লেখক যেন পাঠককে সমস্ত কাজের চাপ ও জাগতিক ব্যস্ততা থেকে দূরে সরিয়ে উপন্যাসের এক মায়াবী জগতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। এই আন্তরিক ও চমৎকার আমন্ত্রণে যেকোনো পাঠকই খুব সহজে আকৃষ্ট হবেন।

বইটির একটি পরিচ্ছেদের নাম ‘সায়ানাইড ফুল’। নামটিতে এত অদ্ভুত এক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই পরিচ্ছেদের চিত্রকল্পগুলো যেন আমাদের নিজেদের জীবনের হতাশাগ্রস্ত সময়গুলোকেই মনে করিয়ে দেয়। জীবনে যখন আকস্মিক হতাশা নেমে আসে, আমরা যখন পেছনের দিনগুলোর হিসেব মেলাতে বসি, তখন কফিনের মতো দমবন্ধ করা এক অনুভূতি আমাদের চেপে ধরে। এই পরিচ্ছেদটি পড়ার সময় পাঠক নিজের সেই হতাশাময় দিনগুলোর অনুভূতির সাথে দারুণ এক সংযোগ খুঁজে পাবেন। আরিমাতানোকে চেনার জন্য এবং উপন্যাসের গভীরে প্রবেশের জন্য এটি একটি নিখুঁত পরিচ্ছেদ।

বইয়ের একটি জায়গায় লেখা রয়েছে—

“ঘুম মানেই মরণ। ঘুমিয়ে গেলেই মানুষের মরণ হয়।”

এই বাক্যটি পড়ার পর এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করেছি। কারণ, ব্যক্তিগতভাবে আমার ভাবনাও ঠিক এমনই! লেখকের চিন্তার সাথে নিজের ভাবনার এই দারুণ সাযুজ্য দেখে সেই বিখ্যাত প্রবাদটির কথাই মনে পড়ে গেল—“Great minds think alike!”

কলেজ কিংবা ভার্সিটি জীবনের আগে আমাদের যে সুদীর্ঘ শৈশব ও কৈশোর কাটে, সেখানে আমরা একধরনের মোহময় উদাসীনতায় বুঁদ হয়ে থাকি। বড় হওয়ার পর মনে হয়, চোখের পলকেই যেন সেই সোনালি দিনগুলো ফুরিয়ে গেল! ‘আরিমাতানো’ উপন্যাসে সেই ফেলে আসা কৈশোরের দিনগুলোকে যেন নতুন করে খুঁজে পাওয়া যায়। পড়তে পড়তে মনে হয়—আমিও তো ঠিক এমনই উদাসীন ছিলাম, কিংবা চিরকাল এমন উদাসীনই থাকতে চেয়েছিলাম! আমাদের এই সার্বজনীন উদাসীনতার বোধ থেকেই হয়তো লেখক লিখেছেন—

“আমার পায়ে জমাট শিকড়, যেতে পারি না কোথাও, যাওয়ার ইচ্ছাও দূরগামী নক্ষত্র।”

তবুও আমরা এই উদাসীনতা ধরে রাখতে পারি না। একসময় বাধ্য হয়েই বরণ করে নিতে হয় জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে। আরিমাতানোকেও ঠিক একই পথে হাঁটতে হয়েছে। তবে সে সেই বাস্তবতাকে খুব সহজে গ্রহণ করে নিয়েছিল; খুঁজে নিয়েছিল পরম বন্ধুকে। আবার দ্বিধান্বিত ভালোবাসাকেও সে ছুঁয়ে গেছে না-ছোঁয়ার মতো এক অদ্ভুত দূরত্ব বজায় রেখে।

আরিমাতানোর জন্মগত রহস্য দিয়ে উপন্যাসের যে ঘেরাটোপ তৈরি হয়, তা জানতে পাঠককে অপেক্ষা করতে হয় একদম শেষ পাতা পর্যন্ত। এর ফাঁকে আপনি পার করে ফেলবেন একটি মানুষের জীবনের ছাব্বিশ কিংবা আঠাশটি বসন্ত! পুরো উপন্যাসজুড়ে একধরনের না-পাওয়ার বেদনা পাঠককে পোড়াতে থাকবে। আর এই না-পাওয়া থেকেই জন্ম নেয় যাবতীয় রহস্যের। কিন্তু আরিমাতানো এসব কিছু নিয়েই বড্ড উদাস। সে জানতে চায়, কিন্তু শত জোরাজুরিতেও যখন জানা যায় না, তখন উদাস না হয়ে উপায় কী! আমরা কে? আমাদের শুরুটা কোথায় হয়েছিল?—এ নিয়ে দার্শনিকতার কোনো অন্ত নেই। আরিমাতানোও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছে। আমরা কি সেই উত্তর পেয়েছি? আরিমাতানোই কি তা খুঁজে পেয়েছে? মূলত আরিমাতানোর চোখ দিয়ে পাঠক হিসেবে আমিও আরেকবার এই আদিম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি।

এতসব মুগ্ধতার পাশাপাশি উপন্যাসের একটি দুর্বল দিকও চোখে পড়েছে, তা হলো—অযাচিত ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। আমার কাছে এটিকে বাহুল্যই মনে হয়েছে। কারণ, ব্যবহৃত প্রায় প্রতিটি ইংরেজি শব্দেরই অত্যন্ত সুন্দর ও শ্রুতিমধুর বাংলা প্রতিশব্দ রয়েছে। যেমন, ‘অন্তহীন’ শব্দটি লেখা যেত, কিন্তু সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ‘এটার্নাল’। ‘এটার্নাল’ শব্দের মাঝে বাংলার সেই নিজস্ব মায়াটা কোথায়?

অনেকের কাছে মনে হতে পারে, ‘আরিমাতানো’ হয়তো নিছকই কোনো ড্রামা বা ফিকশনাল বায়োগ্রাফি। কিন্তু উপন্যাসে টুইস্ট বা বাঁকবদলের কোনো কমতি নেই। পাঠককে চমকে দেওয়ার জন্য লেখক কেবল শেষ পৃষ্ঠার অপেক্ষায় বসে থাকেননি; উপন্যাসের মাঝামাঝি সময়েও আচমকা কিছু টুইস্ট এসে ধাক্কা দেয়। আর একদম শেষ পর্বের টুইস্টের ভার লেখক খুব সন্তর্পণে পাঠকদের চিন্তার ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন।

পরিশেষে বলতে চাই—প্রবাদে আছে, এক শালিক দেখলে নাকি ক্ষতি হয়। তেমনি এমন চমৎকার একটি উপন্যাস লিখে লেখক যদি থেমে যান, তবে তা আমাদের মতো পাঠকদের জন্যই বড় ক্ষতির কারণ হবে। আশা করব, এমন মননশীল ও দারুণ সব উপন্যাস লিখে লেখক মাহবুব ময়ুখ রিশাদ আগামীতেও আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে যাবেন।

অন্যদেরও পড়তে দিন