আপনার আগের রিভিউগুলোর ধারাবাহিকতায় এই চমৎকার ও তথ্যবহুল পাঠপ্রতিক্রিয়াটিকেও একটি পেশাদার, সুসংগঠিত এবং আকর্ষণীয় গ্রন্থালোচনার রূপ দেওয়া হলো। আপনার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ, রেফারেন্স (যেমন: সাখাওয়াত টিপুর বক্তব্য) এবং দারুণ সব উপমা (যেমন: চুরি করে পাপ কমানোর প্রসঙ্গ) অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে, শুধু ভাষার গাঁথুনিকে আরেকটু প্রমিত ও মজবুত করা হয়েছে।
গ্রন্থালোচনা: পাঠ, পরিব্রাজন ও আড্ডার অনবদ্য আখ্যান
চটজলদি সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ ও নিজের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে চাইলে এই ধরনের বইয়ের বিকল্প মেলা ভার। এতে লেখকের সাহিত্য সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে। লেখক নিজে ভ্রমণপিপাসু হওয়ায়, গতানুগতিক ভ্রমণকাহিনির বাইরে গিয়ে ভিনদেশের এমন সব বিষয় উঠে এসেছে, যা সত্যিই অভাবনীয়। যেমন—কোন দেশের কোথায় পুরোনো বইয়ের দোকান আছে, সেসব দোকানে কী ধরনের বই পাওয়া যায়, তা ঢাকার এক ছোট্ট কোণে বসেই এই বইয়ের কল্যাণে জেনে ফেলা যায়!
এখন তো লেখকদের সাথে আড্ডা দেওয়ার চল প্রায় উঠেই গেছে। আজিজ সুপার মার্কেটকেন্দ্রিক সেই জমজমাট সাহিত্যিক আড্ডা আজ যেন কেবলই রূপকথার গল্প। প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদের সাথে সামনাসামনি বসে খোশগল্প করার সুযোগ যদি কখনো মিলত, তবে কেমন হতো—বইটি যেন পাঠকের সেই আক্ষেপ অনেকটাই ঘুচিয়ে দেয়।
বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়েই আড্ডার ঢঙে জানা যায় বিশ্বসাহিত্যের বড় বড় উপন্যাস প্রকাশের আগে কত শতবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ‘নারনিয়া’ সিরিজ ৭০০ বার এবং ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’-এর মতো ক্ল্যাসিক ৩৮ বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল! মার্গারেট মিচেলের লেখা একমাত্র উপন্যাস এই ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’, যা তিনি লিখেছিলেন মূলত স্বামীর কটূক্তির জবাব দিতে। স্বামী তাকে খোঁচা মেরে বলেছিলেন, “এত যে পড়ো, কোনোদিন এক লাইন তো লিখতে দেখি না!” প্রকাশের এত ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল বলেই কি তিনি আর কিছু লেখেননি—সে সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হালের ‘হ্যারি পটার’ নিয়েও এমন প্রত্যাখ্যানের গল্প আছে। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ লেগেছে, প্রকাশকেরা যখন পাণ্ডুলিপি ছাপাতে না চেয়ে উল্টো সেটি কেন ‘ছাপার অযোগ্য’, তার বিশাল বয়ান দিয়ে লেখককে চিঠি পাঠাতেন। এর মধ্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে পাঠানো প্রত্যাখ্যানের চিঠিটি ছিল সবচেয়ে মারাত্মক! প্রকাশকদের এমন ভুল বিচার বা জাজমেন্ট নিয়ে বইটিতে দারুণ মজার একটি অধ্যায় রয়েছে। উল্লিখিত বইগুলো তো শেষমেশ আলোর মুখ দেখেছিল, কিন্তু প্রকাশকদের এমন অযাচিত সিদ্ধান্তের কবলে পড়ে আরও কত মাস্টারপিস চিরতরে হারিয়ে গেছে, কে জানে!
ওয়াসি আহমেদ বইটিতে বেশ কয়েকবার এমন লেখকদের নিয়ে আলোচনা করেছেন, যাঁরা পরিমাণে খুব কম লিখেও সময়কে জয় করেছেন। এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটে কথাসাহিত্যিক বিপ্লব দাশকে নিয়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে চিনতাম না। লেখক নিজেও বলেছেন, বিপ্লব দাশ আজ প্রায় বিস্মৃত এবং সাহিত্যের কোনো আড্ডায় তাঁকে সেভাবে স্মরণও করা হয় না। কিন্তু লেখার কায়দা-কৌশলে তিনি যে কতটা স্বতন্ত্র ছিলেন, তার উদাহরণ টানতে গিয়ে লেখক বলেছেন, “আমাদের কথাসাহিত্যে তাঁর পূর্বসূরি নেই।” বিপ্লব দাশের প্রতি লেখকের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা আমাকে তাঁর লেখা পড়তে প্রবলভাবে উসকে দিয়েছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বেলাতেও একই বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। ইলিয়াসও খুব কম লিখেছেন, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে যে প্রভাব তিনি রেখে গেছেন, তা ডিঙানোর সাধ্য কারও নেই। তবে ওয়াসি আহমেদের হতাশার জায়গাটি ভিন্ন। তিনি আক্ষেপ করেছেন—উপযুক্ত অনুবাদকের অভাবে বিশ্ববাসী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের শক্তিশালী সাহিত্য সম্পর্কে আজও অজ্ঞ। শুধু কি ইলিয়াস? বাংলা ভাষায় এমন কয়েক ডজন উপন্যাস রয়েছে, যা অনুবাদের অভাবে বছরের পর বছর বিশ্ববাসীর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে কয়েকদিন আগে বইমেলায় ‘লেখক মঞ্চে’ কবি সাখাওয়াত টিপুর একটি বক্তব্য জুড়ে দিতে চাই। তিনি বলেছিলেন, “বাংলা একাডেমির নিজস্ব যেসব কাজ রয়েছে, সেগুলো তারা করে না। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অনুবাদ করে বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটা তাদেরই করা উচিত। তাদের একটি অনুবাদক দলও রয়েছে, কিন্তু তারা আসলে কী করে বা আদৌ কিছু অনুবাদ করে কি না, তা আমার জানা নেই।”
নোবেল পুরস্কার নিয়ে লেখক বইটিতে কড়া সমালোচনা করেছেন। নোবেল কমিটি কীভাবে রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে টলস্টয়, চেকভ, বোর্হেস কিংবা কাফকার মতো যুগান্তকারী সাহিত্যিকদের পুরস্কারবঞ্চিত করেছে—তার চমৎকার বর্ণনা রয়েছে এখানে, যা আমার মতো সাধারণ পাঠকের কাছে একদমই নতুন। নোবেল কমিটির এই রাজনীতির অধ্যায়টি পড়তে পড়তে আমাদের দেশের একাডেমি পুরস্কার নিয়েও ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি চলে আসে। বোধ হয় পৃথিবীতে পুরস্কার প্রদানকারী কমিটিগুলোর ‘পারফেকশন’ বলে কিছু নেই। সবখানেই ভেজাল! সর্বত্রই তারা প্রচুর অযোগ্য লোককে পুরস্কার দিয়ে, পরে যোগ্য দু-একজনকে দিয়ে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করে। ব্যাপারটা যেন চুরি করে পাপ কমানোর আশায় মসজিদ-মন্দিরে দান করার মতো!
লেখক ওয়াসি আহমেদ লেখার আগে নিজে যে একজন আপাদমস্তক পাঠক, তার বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায় “পাঠ বদলে যায়” এবং “উত্তরাধিকার-এর শহীদ কাদরী” অধ্যায়গুলোতে। ‘পাঠ বদলে যায়’ অংশটির সাথে নিজেকে খুব গভীরভাবে মেলাতে পেরেছি। পাঠকের যেমন মৃত্যু হয়, তেমনি কোনো লেখা একসময় পড়ে ভালো না লাগলেও, পরবর্তীতে বয়স ও মননশীলতার সাথে সাথে আমরা ঠিকই সেই লেখার মর্মে প্রবেশ করতে পারি। পাঠ বদলের এই বিবর্তন নিয়ে ওয়াসি আহমেদের আলোচনার ভঙ্গি সত্যিই অনবদ্য।
বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে এত এত চমকপ্রদ তথ্য আর অভিজ্ঞতার ঝুলি ছড়ানো রয়েছে যে, এটি পড়ার পর সবচেয়ে বেশি যে আগ্রহটি জাগছে তা হলো—ওয়াসি আহমেদ কবে তাঁর আত্মজীবনী লিখবেন? পাঠ ও অভিজ্ঞতায় এমন ঋদ্ধ একজন লেখকের আত্মজীবনী যে কতটা রোমাঞ্চকর হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বইটি নিয়ে লিখতে বসে আরেকটি আস্ত বই লিখে ফেলার ইচ্ছে নেই। তাই মুগ্ধতার এই আলাপ এখানেই শেষ করছি।
আমি