মূল লেখায় যান
রাইসুল সোহান
সব লেখা

আমার গল্প | ফরিদ কবির

বই

গল্পের শুরুটা হয়েছিল তাঁর বাবাকে দিয়ে। এ যেন এক জীবনের ভেতর অন্য এক জীবনের আখ্যান। সেই গল্পে কী দারুণ সাসপেন্স! পাঠককে যেন চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায় সেই অভাবনীয় দৃশ্যে—ট্রেন থেকে অচেনা স্টেশনে নেমে আসা, দুই-তিন দিন খেতে না পাওয়া ১০ বছরের এক বালকের ছোট্ট দেহে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর, চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে; স্বজনহীন এই বিশাল ঢাকা শহরে সে একদম একা! ছোটবেলায় প্রতি শুক্রবারে বিটিভির বাংলা সিনেমায় আমরা এমন দৃশ্য দেখতাম। কিন্তু সিনেমার ভাবনাগুলো আসে কোথা থেকে? বাস্তব জীবন থেকেই তো! কবি ফরিদ কবিরের বাবা সাদুল্লাহ সেই নিরেট বাস্তবতাকে তীব্র যন্ত্রণায় ছুঁয়ে বড় হয়েছেন। আর কবি তাঁর চমৎকার লেখনী দিয়ে বালক সাদুল্লাহর সেই কষ্টময় দিনগুলোর অনুভূতি আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এটি কোনো সিনেমা নয়, নিরেট বাস্তবতা!

বইটি পড়তে পড়তে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, ফরিদ কবিরের সেই বিখ্যাত ‘ট্রেন’ কবিতাটি কি তাঁর বাবার জীবনের এই ঘটনা থেকেই লেখা?

‘ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল মাঝপথে, অচেনা স্টেশনে মানুষ যেখানে যেতে চায় সেটাই কি গন্তব্য? নাকি, তারা যেখানে নামে? নাকি, গন্তব্যই খুঁজে নেয় তার নিজস্ব মানুষ! বিহ্বল স্টেশনে নেমে আমরাও ভাবি— এখানেই কি নামতে চেয়েছি নাকি, ট্রেনই নামিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের …. …. এই ঘন কুয়াশারাত্রিতে!’

ফরিদ কবিরের ‘আমার গল্প’ মূলত একটি মলাটের ভেতর অসংখ্য গল্পের সমাহার। যে গল্পের শুরু হয়েছিল পিতার আখ্যান দিয়ে, শেষও হয় পিতাকে দিয়ে। কিন্তু মাঝের বড় একটা সময় সমান্তরালে এগিয়েছে পিতার জীবন আর কবির নিজের জীবন। পিতা সাদুল্লাহ যেমন আগের দিনের ঘটনা পরের দিনই ভুলে যেতেন, ফরিদ কবিরকেও একই স্বীকারোক্তি করতে দেখি। এই বই যেন পিতাপুত্রের এক অদৃশ্য মিল খোঁজারও অদ্ভুত এক যাত্রা। তাদের জীবনের এই চড়াই-উতরাই থ্রিলার সিনেমার রোলারকোস্টারকেও যেন হার মানায়!

স্কুলপড়ুয়া ফরিদ কবিরের জবানিতে আমরা শুনতে পাই পুরোনো ঢাকায় সাতসকালে কলপাড়ে দুই নারীর কলহ আর অকথ্য গালিগালাজ; কিংবা দিনের পর দিন মার খেয়েও টেলিভিশনের প্রতি এক কিশোরের অদম্য উৎসাহের কথা। মুক্তিযুদ্ধের নরকাগ্নির সময়কালেও পুরোনো ঢাকার প্রাত্যহিক জীবনের এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতা আমরা দেখতে পাই লেখকের চোখে। চারদিকে যখন যুদ্ধ, তখন মে মাসেই হচ্ছে হুমায়ুন মামার বিয়ের উৎসব! আবার জানা যায়, ৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে অজানা আশঙ্কায় কীভাবে হাজারে হাজারে মানুষ ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছিল। লঞ্চঘাটে মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে রাজাকারদের মারছেন, তার জীবন্ত দৃশ্য তিনি এঁকেছেন ঢিবঢিব বুকে—কারণ মানুষ হত্যার দৃশ্য তাঁর জীবনে সেটাই প্রথম ছিল।

লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সূচনা ঘটে যখন তিনি টেলিভিশনের নেশা ছেড়ে পুরোদস্তুর ‘বইয়ের পোকা’ হয়ে ওঠেন। ‘রিয়া’র সাথে চিঠি চালাচালি ফরিদ কবিরকে কবি হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তবে এর জন্য তিনি দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছেন। লেখার আগে হয়েছেন প্রথম সারির একজন পাঠক। ভাষাজ্ঞান ও শব্দশৈলী নির্মাণের জন্য এদেশের প্রধান কবিদের সাহচর্য নিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের কবিদের সাথে জমিয়ে সাহিত্য আড্ডা দিয়েছেন। জ্ঞান কুড়িয়ে একসময় তিনি কবি শামসুর রাহমানের বাসায় জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতো মানুষের সাথে নিজের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ছন্দ ও মাত্রাজ্ঞানের যে বাহাস করেছেন, তা পড়ে সত্যিই বিস্ময় জাগে।

বইটিতে শহীদুল জহিরের সাথে ছোট্ট সুন্দর একটি সাক্ষাৎপর্ব রয়েছে, যেখানে কীর্তিমান জহির আক্ষেপ করে বলেন, “প্লিজ জানাবেন বই পড়ে কেমন লাগল। বই নিয়ে কেউ কিছুই জানায় না।” আশি ও নব্বইয়ের দশকে ঢাকা-কলকাতার এমন কোনো কবি বা সাহিত্যিক বোধ হয় বাকি ছিলেন না, যাঁর সাথে ফরিদ কবিরের পরিচয় বা আড্ডা হয়নি। সত্যজিৎ রায়ের সাথে আধা ঘণ্টার সাক্ষাৎ (যেখানে সত্যজিৎ কৈফিয়তের সুরে জানিয়েছিলেন যে তিনি খুব একটা কবিতা পড়েন না) কিংবা হুমায়ুন আজাদের মতো মহীরুহের সাথে তাঁর চটুল, অম্লমধুর সম্পর্ক সত্যিই ঈর্ষণীয়। সেই অতুলনীয় প্রজন্মের সোনালি দিনগুলোর কথা পড়ে কেবল দীর্ঘশ্বাসই ফেলা যায়।

বইটিতে সাংবাদিকতার জগতের অন্দরমহলের রাজনীতি পড়ে অবাক হতে হয়। ‘আজকের কাগজ’ ও ‘ভোরের কাগজ’-এর সৃষ্টি এবং পতনের ঐতিহাসিক তথ্য তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে তুলে ধরেছেন। মতিউর রহমানের উত্থান এবং কীভাবে সামান্য গুটি চালিয়ে একটি পুরো স্বপ্নকে দুমড়ে দেওয়া যায়—এই আত্মজীবনী না পড়লে তা হয়তো অজানাই থেকে যেত। ভালো মানুষের মুখোশ পরে সমাজে চলাফেরা করা ব্যক্তিরা স্বার্থের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা তিনি অবলীলায় উন্মোচন করেছেন।

আত্মজীবনী মানেই যেখানে নিজেকে ধোয়া তুলসীপাতা প্রমাণের এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে ফরিদ কবির নিজের প্রেম, যৌনতা বা পতিতালয় গমনের কথা খোলামেলাভাবে স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর সাহসিকতার মূল জায়গা এটি নয়। বিপুল দেনা মাথায় নিয়ে জীবনের কঠিনতম সময়ে তিনি সাংসারিক দায়দায়িত্ব এড়িয়ে পালিয়ে যাননি, বরং শক্ত হাতে কঠিন বাস্তবতাকে জয় করেছেন। বাজারের সস্তা মোটিভেশনাল বইয়ের চেয়ে সত্যিকারের অনুপ্রেরণা পেতে ফরিদ কবিরের এই অবারিত জীবনসংগ্রাম অনেক বেশি কার্যকর।

রিভিউটি শেষ করছি ব্যক্তিগত একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা দিয়ে। ফরিদ কবিরের সাথে আমার একবারই আলাপ হয়েছে। আলাপে তিনি এতটাই সপ্রতিভ ছিলেন যে, তাঁকে একেবারেই ‘মাই ডিয়ার’ স্বভাবের মানুষ মনে হয়েছে। মনেই হয়নি প্রথমবার এত বড় মাপের একজন লেখকের সাথে কথা বলছি। স্বাধীনতা-উত্তর অস্থির সময়কে নিজস্ব ক্যানভাসে তিনি যেভাবে ধরেছেন, তাতে বাংলা কবিতায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শক্তিমান কবিদের ভিড়েও আশি-নব্বই দশকে খুব সাদামাটাভাবে, কম কথায় তিনি নিজের শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এমন একজন জীবন্ত ও শক্তিমান লেখকের সাথে কাটানো সামান্য সময়টুকু আমার কাছে এক দারুণ সুখস্মৃতি হয়েই থাকবে। হয়তো পরবর্তী সংস্করণে বইটিতে এমন আরও অনেক অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসবে—সেই অপেক্ষাতেই রইলাম।

অন্যদেরও পড়তে দিন