মূল লেখায় যান
রাইসুল সোহান
সব লেখা

কী আগুনে পুড়ে যায় ঘর, জানে না উঠোন

বই

“বা, অথবা কিংবা” বইটা পড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা বলে উঠলাম তা হলো, ‘বাব্বাহ! এইভাবেও টানা লিখে যেতে পারে কেউ!’

এবারের বইমেলায় ১৫ তারিখে হাসান ভাইয়ের সাথে দ্বিতীয়বার দেখা। টুকটাক আড্ডার ফাঁকে তাঁকে বললাম, ‘ভাই, আপনার পছন্দের একটা বই কিনে দিন।’ পাশেই রিশাদ ছিল, কথাটি শুনে সে বলে উঠল, ‘আশান ভাইয়ের বইটা কেন, পড়ে মজা পাবি।’ মূলত সেই সূত্র ধরেই আশান উজ জামানের ‘বা, অথবা কিংবা’ বইটি আমার হাতে আসে। তবে বলাই বাহুল্য, নিজস্ব আলসেমির কারণে বেশ কিছুদিন বইটি আর পড়ে ওঠা হয়নি।

অবশেষে সব আলসেমি দূরে ঠেলে যেদিন বইটি নিয়ে বসলাম, সত্যি বলতে প্রথম পাঠেই চমকে উঠতে হলো! বইটা পড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মনে এক মিশ্র বিস্ময় জাগে—কেউ এভাবেও টানা লিখে যেতে পারে! প্রথম গল্পের প্রারম্ভিক অংশটি পড়লে মুহূর্তের জন্য একে মুক্তগদ্য বলে ভ্রম হতে পারে। কিন্তু সেই বিভ্রম কাটতে সময় লাগে না; পাঠক খুব দ্রুতই লেখকের তৈরি করা নিজস্ব এক ভাষা ও ঘোরের জগতে নিমজ্জিত হন। ছোট ছোট কিন্তু শাণিত বাক্যবিন্যাস যেন ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ। লেখার বুননে কোথাও কোনো শূন্যতা তৈরি হলে, লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে চরিত্রগুলোর প্রখর আঞ্চলিক কথোপকথন দিয়ে তা ঢেকে দিয়েছেন। পূর্বপরিকল্পিত ও সুগুছিয়ে গল্প বলার এই ঢঙ সত্যিই অবাক করার মতো।

গল্পগুলোর বিষয়বস্তু নির্বাচনেও লেখক আশান উজ জামানের প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার প্রমাণ মেলে। সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির রুক্ষ বাস্তবতাগুলো তাঁর কলমে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছে। “শিশু । স্বর্গ । নরক” গল্পে তিনি সমসাময়িক নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মতো নির্মম ট্র্যাজেডিকে গল্পের উপজীব্য করেছেন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে। অন্যদিকে, “কী আগুনে পুড়ে যায় ঘর, জানে না উঠোন” গল্পে ধর্মান্ধতা ও বিভেদের এক নিষ্ঠুর চিত্র ফুটে উঠেছে। মর্গের হিমশীতল আবহে এক হিন্দু নারী ও এক পুরুষের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে লেখক যে রহস্যের জাল বুনেছেন, তা পাঠককে ভাবনার এক নতুন স্তরে নিয়ে যায়। পুরুষটি কি আসলেই মুসলমান ছিল? সে উত্তর নাহয় পাঠক নিজেই গল্প পড়ে খুঁজে নিন।

সমসাময়িক ঘটনার পাশাপাশি লেখক তুলে এনেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে রাষ্ট্রের এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যখন সনদের তোয়াক্কা না করে অবহেলিত জীবন পার করছেন, তখন তাদের নতুন সনদ প্রদানের দায়িত্বে বসে থাকতে দেখা যায় এক রাজাকারকে—রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এই চরম প্রহসন ও অথর্বতা লেখক অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন।

বইটির সর্বশেষ গল্প “আকাশ ভেঙে মুখে দিলেই বিদঘুটে স্বাদ”-এ রয়েছে এক অনন্য প্লট। দুই দেশের সীমান্তের মাঝে আটকে পড়া ‘রহমালি’ নামের এক চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই গল্পের পরতে পরতে রয়েছে উৎকণ্ঠা। এর বেশি কিছু বলে পাঠকের পাঠ-রোমাঞ্চ নষ্ট করা ঠিক হবে না, গল্পটি আবিষ্কারের সুযোগ পাঠকের জন্যই তোলা রইল।

বইটির আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো—মৃত্যুর বহুল উপস্থিতি। প্রতিদিন আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অসংখ্য মৃত্যু ও লাশের মিছিল দেখে আমরা যেভাবে চোখ বুজে থাকার ভান করি, লেখক যেন সেই বদ্ধ চোখে প্রবল এক ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে চেয়েছেন—চোখ খুলুন, দেখুন প্রতিদিন কত মানুষ লাশ হয়ে যাচ্ছে!

বর্তমান প্রকাশনা জগতে সস্তা জনপ্রিয়তার স্রোতে ও চটুল সাহিত্যের ভিড়ে এমন শাণিত এবং জীবনঘনিষ্ঠ বই সচরাচর চোখে পড়ে না। ভেবে অবাক লাগে, এমন দারুণ ধারালো ও ঝাঁঝালো একজন লেখক থাকতেও মানুষ কীভাবে সস্তা বইয়ের জন্য স্টলগুলোতে ঝাঁপিয়ে পড়ে! ফালতু লেখা নিয়ে যতই উন্মাদনা তৈরি হোক না কেন, দুই পা এগিয়ে ভালো লেখা এবং লেখককে তুলে ধরার দায়িত্ব আমাদেরই। খুঁজে খুঁজে আমাদের এমন মননশীল সাহিত্যের পঠনে ফিরে আসতেই হবে।

সমকালীন গ্রাম-বাংলার সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে কড়া নজর রেখে গাঁথা মোট বারোটি গল্পের এই সংকলনটি বাংলা সাহিত্যে সন্দেহাতীতভাবে একটি দারুণ সংযোজন। সময়ের সাথে সাথে আশান উজ জামানের এই গল্পগুলো পাঠকের কাছে ‘কাল্ট ক্ল্যাসিক’ হয়ে উঠবে বলেই আমার বিশ্বাস।

অন্যদেরও পড়তে দিন