মূল লেখায় যান
রাইসুল সোহান
সব লেখা

বিদায়বেলার গানে বড়োদের গল্প যেমন হয়

বই

আহমাদ মোস্তফা কামালের নতুন গল্পগ্রন্থের নামগল্প “বড়োদের গল্প যেমন হয়” মূলত আমাদের একদম সমকালের আখ্যান; গত প্রায় এক দশক ধরে বয়ে চলা বাংলাদেশের অস্থির সময়ের এক প্রামাণ্য দলিল। এখানে কোনো লুকোছাপার আয়োজন নেই। আমরা যে কতটা ভীতিকর ও দ্বিধাগ্রস্ত একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা এত স্পষ্টভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো গল্প খুব কমই পড়েছি। গল্পটি দারুণ মেটাফোরিক বা রূপকধর্মী। বর্তমানের এই শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে এমন একটি গল্প লিখে বইয়ের মলাটে নিয়ে আসাটা নিঃসন্দেহে অনেক বড় সাহসের ব্যাপার। সাহসের কথাটি এজন্যই বিশেষভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ লেখকের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে জানতে পেরেছি—বর্তমান সময়ের কোনো পত্রিকা সম্পাদকেরই নাকি এই গল্পটি ছাপানোর মতো সাহস হয়নি!

বইটির রাজনৈতিক সচেতনতামূলক আরেকটি শক্তিশালী গল্প “অমৃতের পুত্র”। আমরা প্রতিনিয়ত কত শত প্রতিবাদী কথা বলতে চাই, কিন্তু পারি না। কেন পারি না? কোথায় আমাদের মন আটকে থাকে? ক্ষোভের কথাগুলো কেন গলায় এসে দলা পাকিয়ে যায়? লেখক যেন মাঝির নৌকার গুণ টানার মতো করে আমাদের সেই অব্যক্ত কথাগুলোকেই সজোরে টেনে বের করে এনেছেন এই গল্পে।

“যারা হারিয়ে যায়” গল্পটি অদ্ভুত সুন্দর এক বিষাদে মোড়ানো। জীবনের ইঁদুরদৌড় বা প্রতিযোগিতায় যাদের কোনো আগ্রহ নেই, যারা সমাজ থেকে একটু আড়ালে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল—কিন্তু সমাজবাস্তবতার নির্মম চাপে যাদেরকেও সেই প্রতিযোগিতায় শামিল হতে হয়, এটি মূলত তাদেরই গল্প। শেষ পর্যন্ত কি এই মানুষেরা আসলেই হারিয়ে যায়? কীভাবে তারা মেনে নেয় এই অপ্রত্যাশিত ছকে বাঁধা জীবন? এই প্রশ্নের যে উত্তর লেখক এখানে দিয়েছেন, তারই আরেকটি ভিন্নধর্মী সমীকরণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন “বিদায় বেলার গান” গল্পটিতে।

সাধারণ মানুষ চায় একটু নিশ্চিন্ত ও উপদ্রবহীন জীবন কাটাতে, যা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কেন অসম্ভব? তার উত্তর মিলবে “যখন সন্ধ্যা নেমে আসে” গল্পে। রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া এক শিশুকে কেন্দ্র করে এক সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়, তারই এক নিপুণ চিত্রায়ণ এটি। শত বাধা সত্ত্বেও নিঃসন্তান জীবনে শিশুটিকে নিয়ে সে একটু আনন্দের ছোঁয়া পেতে চায়। কিন্তু নিয়তি কি তা হতে দেয়? এই চরম প্রতিযোগিতামূলক সমাজ কি তথাকথিত ‘মোটিভেশনাল’ বক্তব্যহীন সাদামাটা একটি জীবনকে এত সহজেই নিষ্কৃতি দেয়?

এই সংকলনের আরেকটি চমকপ্রদ গল্প “আক্রোশ”। গল্পটির উপস্থাপন রীতিমতো আকর্ষণীয় ও উত্তেজক। কথায় কথায় সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন বা বিপ্লব করতে চাওয়া মানুষদের বিপ্লবের গণ্ডি যে আসলে মোটে ৩০ মিনিটের একটা ব্যাপার—তা লেখক অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে এই গল্পে উন্মোচন করেছেন।

বইয়ের আলোচনা শেষ করতে চাই “খেলা” গল্পটি দিয়ে। আমার মতে, এটি সম্ভবত এই বইয়ের সেরা গল্প। এই গল্পটি পড়ার আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল নামগল্পটিই হয়তো সেরা, কিন্তু “খেলা” পড়ার পর সেই ধারণা বদলে যায়। এটি দারুণ এক প্রতীকি গল্প। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থাকা একনায়কদের আসল ক্ষোভ বা ভয় কাদের ওপর থাকে? সৃজনশীল মানুষদের নিয়ে তাদের যে প্রবল ভীতি—এই বুঝি তারা কলমের খোঁচায় সব ফাঁস করে দিল—সেই মনস্তত্ত্ব এখানে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। এর পরিণতি কী হয়, তা জানতে হলে পাঠককে গল্পের স্বাদ নিতেই হবে।

আহমাদ মোস্তফা কামালের দশটি নতুন গল্প নিয়ে সাজানো “বড়োদের গল্প যেমন হয়” বইটি পাঠকের জন্য দুই ঘণ্টার এক দারুণ উপভোগ্য ভ্রমণ। এই ভ্রমণ যেন দীর্ঘ যাত্রার কোনো বাসে জানালার পাশে বসে থাকা যাত্রীর চোখে দেখা দৃশ্যাবলির মতো—যেখানে কাঁচের এপাশ থেকে একে একে দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা, জীবনের নানা ক্যানভাস আর উত্থান-পতনের নিখুঁত চিত্র। এই চমৎকার সাহিত্য-ভ্রমণে যেকোনো মননশীল পাঠকের জন্যই রইল উষ্ণ আমন্ত্রণ।

অন্যদেরও পড়তে দিন