২০১৭ সালের ৩ আগস্ট, বিকেলবেলা, নেইমারের আইনজীবীরা বার্সেলোনার অফিসে ঢুকলেন। হাতে বাইশ কোটি বিশ লাখ ইউরো।
ওইদিন সকালেই তারা গিয়েছিলেন লা লিগার দপ্তরে। স্পেনের নিয়ম অনুযায়ী রিলিজ ক্লজের টাকা লিগের কাছে জমা দিতে হয়, লিগ সেটা ক্লাবকে পৌঁছে দেয়। লা লিগা টাকা নিতে রাজি হলো না। তাদের যুক্তি, পিএসজি উয়েফার ফিনান্সিয়াল ফেয়ার প্লে ভাঙছে।
আইনজীবীরা তখন সোজা বার্সেলোনার অফিসে চলে গেলেন। ক্লাব সেদিন যে বিবৃতি দিয়েছিল, তাতে একটা লাইন আছে যেটা প্রায় কেউ পড়েনি। টাকা জমা হয়েছে খেলোয়াড়ের নামে, দুই পক্ষের চুক্তি একতরফাভাবে ভাঙার ক্ষতিপূরণ হিসেবে।
পিএসজি বার্সেলোনাকে ২২২ মিলিয়ন দেয়নি। নেইমার দিয়েছেন। কাগজে অন্তত তাই লেখা।
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ট্রান্সফার আইনের চোখে একজন লোকের নিজেকে কিনে নেওয়া।
ফুটবলে কেউ কাউকে কেনে না। কেনার মতো কিছুই নেই সেখানে। একজন মানুষকে কেনা যায় না, বিক্রিও করা যায় না, আধুনিক আইনে এটা নিয়ে কোনো তর্ক বাকি নেই।
যা হাতবদল হয় সেটা একটা কাগজ। রেজিস্ট্রেশন। ফেডারেশনের খাতায় নামটা কোন ক্লাবের ঘরে বসে থাকবে, শুধু সেটাই। আর ট্রান্সফার ফি হলো একটা চুক্তির বাকি বছরগুলোর দাম। ক্ষতিপূরণ।
মানে ফুটবলের গোটা টাকার বাজার দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা প্রতিশ্রুতির উপর। কেউ পাঁচ বছরের কথা দিয়ে দুই বছরে চলে যাচ্ছে, বাকি তিন বছরের দাম কেউ একজন মিটিয়ে দিচ্ছে। ওই মেটানোই ট্রান্সফার ফি।
স্পেনে ব্যাপারটা একটু আলাদা, আর ওখানেই নেইমারের গল্প। ১৯৮৫ সালের রয়্যাল ডিক্রি ১০০৬ বলে স্পেনের পেশাদার খেলোয়াড় অন্য যেকোনো শ্রমিকের মতোই চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন, শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিতে হবে। আদালতে গিয়ে অঙ্ক ঠিক করার ঝামেলা এড়াতে ক্লাব আর খেলোয়াড় আগেই একটা সংখ্যা লিখে রাখে চুক্তিতে। ওটাই বাইআউট ক্লজ।
উনারা সংখ্যাটা এত বড় করে রাখেন যাতে কেউ ছুঁতে না পারে। মেসির ক্লজ একসময় ছিল ৭০ কোটি ইউরো। দেয়াল হিসেবে বানানো, দরজা হিসেবে নয়। নেইমারের বেলায় দেয়ালটা ভেঙে গেল, কারণ কাতারের একটা রাষ্ট্রীয় তহবিলের কাছে ২২২ মিলিয়ন দেয়াল নয়, চৌকাঠ।
একটা ট্রান্সফার ফি বিক্রেতা ক্লাবের অ্যাকাউন্টে ঢোকার আগেই কয়েক জায়গায় কেটে বসে।
প্রথমে ফিফার সলিডারিটি মেকানিজম। যেকোনো আন্তর্জাতিক ট্রান্সফারের ৫ শতাংশ যাবে সেইসব ক্লাবের কাছে, যারা খেলোয়াড়টিকে বারো থেকে তেইশ বছর বয়সে খেলিয়েছে। বারো থেকে পনেরো বছরের প্রতি বছরের জন্য মোট ফির দশমিক ২৫ শতাংশ, ষোলো থেকে তেইশের প্রতি বছরের জন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এর বাইরে আছে ট্রেনিং কম্পেনসেশন, প্রথম পেশাদার চুক্তি সই করার সময় পুরোনো ক্লাবগুলোর প্রাপ্য।
শুনতে মনে হয় গ্রামের সেই কোচটা, যিনি বারো বছর বয়সে ছেলেটাকে প্রথম বুট পরিয়েছিলেন, তিনিও কিছু পাবেন। কাগজে পাবেন। ২০২২ সালে গোটা পৃথিবীতে সলিডারিটি বাবদ পরিশোধ হয়েছিল ৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার, আর ট্রেনিং কম্পেনসেশন বাবদ মাত্র ১ কোটি ২১ লাখ। ওই একই বছরের ট্রান্সফার বাজার ছিল কয়েকশ কোটি ডলারের। টাকা যাদের প্রাপ্য ছিল তাদের অনেকেই জানতেনও না যে তারা দাবি করতে পারেন। ফিফা ২০২২ সালে প্যারিসে একটা ক্লিয়ারিং হাউস খুলেছে ঠিক এই কারণেই, যাতে টাকাটা আপনাআপনি ছোট ক্লাবের ঘরে পৌঁছায়।
তারপর এজেন্ট। ২০২৫ সালে ক্লাবগুলো এজেন্টদের সার্ভিস ফি দিয়েছে ১৩৭ কোটি ডলার, আগের বছরের চেয়ে নব্বই শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শুধু ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলোই দিয়েছে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ। ফিফার লাইসেন্স আছে ১০,৯৭৫ জন এজেন্টের। এদের মধ্যে মাত্র ১,৫৫৯ জন ক্লাবের কাছ থেকে এক পয়সাও পেয়েছেন। আর মাত্র ৩৪৮টা লেনদেনে এজেন্ট এক মিলিয়ন ডলারের বেশি নিয়েছেন, ওই ৩৪৮টাই মোট এজেন্ট ফির ৬৮ শতাংশ।
তারপর সেল-অন ক্লজ। পুরোনো ক্লাব বিক্রির সময় লিখে রাখে, ভবিষ্যতে ছেলেটাকে আবার বেচলে লাভের একটা ভাগ আমার। টটেনহ্যাম যখন গ্যারেথ বেলকে রিয়াল মাদ্রিদে পাঠায়, সাউদাম্পটন বসে বসে টাকা পেয়েছিল, কারণ কাগজে ওই লাইনটা লেখা ছিল।
আর টাকাটা এক দফায় আসেও না। বড় ফি প্রায় সবসময় কিস্তিতে, তিন থেকে পাঁচ বছর ধরে। ফলে বিক্রেতা ক্লাব ঘোষণার দিন কোটি কোটি টাকার মালিক হয় না, হয় একটা প্রতিশ্রুতির মালিক। অনেক ক্লাব ওই ভবিষ্যতের কিস্তি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে আজকের টাকা তুলে নেয়। মানে বিক্রির টাকা খরচ হয়ে যায় বিক্রির আগেই।
এবার সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ। যে ক্লাব কিনছে, তার খাতায় খেলোয়াড়টি একটা সম্পদ। বিল্ডিং বা ফটোকপি মেশিনের মতোই।
একশ মিলিয়ন দিয়ে পাঁচ বছরের চুক্তিতে কেউ এলে ক্লাব ওই একশ মিলিয়ন এক বছরে খরচ দেখায় না। পাঁচ ভাগ করে প্রতি বছর কুড়ি মিলিয়ন করে দেখায়। একে বলে অ্যামর্টাইজেশন। খেলোয়াড়ের খাতার দাম প্রতি বছর কমতে থাকে, তৃতীয় বছরে গিয়ে তার বুক ভ্যালু দাঁড়ায় চল্লিশ মিলিয়ন।
চেলসি নতুন মালিকানার পর এই অঙ্কটা টেনে বাড়িয়ে দিয়েছিল। আট বছরের চুক্তি করলে বছরে খরচ পড়ে সাড়ে বারো মিলিয়ন। উয়েফা আর প্রিমিয়ার লিগ পরে নিয়ম করে দিয়েছে, চুক্তি যত বছরেরই হোক, হিসাবের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর ধরা যাবে।
কিন্তু নিজের একাডেমির ছেলের বুক ভ্যালু শূন্য। তাকে কিনতে হয়নি, তাই খাতায় তার কোনো দাম বসেনি। ফলে তাকে চল্লিশ মিলিয়নে বিক্রি করলে চল্লিশ মিলিয়নই লাভ। আর বাইরে থেকে আশি মিলিয়নে আনা ছেলেকে ষাট মিলিয়নে বিক্রি করলে খাতায় সেটা লোকসান।
প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোকে প্রতি বছর ৩০ জুনের মধ্যে হিসাব জমা দিতে হয়, তিন বছরে লোকসান ১০৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি হলে শাস্তি। তাই জুনের শেষ কয়েকটা দিনে অদ্ভুত জিনিসপত্র ঘটে। এক বছর ওই শেষ কদিনে শুধু একাডেমির ছেলেদের কেনাবেচাতেই খরচ হয়েছিল প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন পাউন্ড। চেলসি অ্যাস্টন ভিলাকে ইয়ান মাটসেন দিয়েছে সাড়ে ৩৭ মিলিয়নে, ভিলা চেলসিকে আঠারো বছরের ওমারি কেলিম্যান দিয়েছে ১৯ মিলিয়নে। দুই ক্লাবই নিজের ঘরের ছেলে বেচে খাতায় নিট লাভ তুলেছে।
যে ছেলেটাকে ক্লাব ন বছর বয়সে তুলে এনেছে, তাকে বেচে দেওয়া হয় জুনের শেষ সপ্তাহে, কারণ সে মাঠে যা, খাতায় তার চেয়ে বেশি।
ব্রাজিলে একটা কথা চালু আছে, পিৎজা প্লেয়ার। যে খেলোয়াড়ের ট্রান্সফার মূল্য পিৎজার মতো টুকরো টুকরো করে কাটা, প্রতিটা টুকরোর আলাদা মালিক।
২০০৬ সালে করিন্থিয়ান্স থেকে কার্লোস তেভেজ আর হাভিয়ের মাসচেরানো ওয়েস্ট হ্যামে গেলেন। বিশ্বের সেরা ক্লাবগুলো তখন এদের চাইছিল, উনারা গেলেন প্রিমিয়ার লিগের একটা মাঝারি দলে। কারণ দুজনের ইকোনমিক রাইটস কিনে রেখেছিল কয়েকটা অফশোর কোম্পানি। তেভেজের চুক্তিতে লেখা ছিল, ওই তহবিল ইচ্ছেমতো তাকে যেকোনো ক্লাবে পাঠাতে পারবে, ফি নিয়ে দরদাম করতে পারবে।
করিন্থিয়ান্স ওই ট্রান্সফার থেকে এক পয়সাও পায়নি।
এর নাম থার্ড পার্টি ওনারশিপ। ক্লাবের টাকা নেই, তাই বাইরের বিনিয়োগকারী এসে বলে, আমি আজ তোমাকে নগদ দিচ্ছি, বিনিময়ে ওই ছেলের ভবিষ্যৎ ট্রান্সফার ফির ত্রিশ শতাংশ আমার। ইংল্যান্ড এটা নিষিদ্ধ করে ২০০৮ সালে, ফিফা গোটা পৃথিবীতে ২০১৫ সালের ১ মে থেকে। মিশেল প্লাতিনি একে সরাসরি দাসত্ব বলেছিলেন।
তারপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ফিফা নিয়মে একটা ছোট বদল আনল, যেটা প্রায় কেউ খেয়াল করেনি। এখন খেলোয়াড় নিজেই নিজের ইকোনমিক রাইটসের মালিক হতে পারেন। মানে যে টুকরোগুলো এতদিন তহবিলের হাতে ছিল, সেগুলো এখন খেলোয়াড় নিজের হাতে রাখতে পারেন, সাধারণত কম বেতন মেনে নেওয়ার বিনিময়ে।
১৯৯০ সালে বেলজিয়ামের আরএফসি লিয়েজের সঙ্গে জঁ-মার্ক বসম্যানের চুক্তি শেষ হয়ে গেল। ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব দ্যুনকের্ক তাকে নিতে চাইল।
তখনকার নিয়মে চুক্তি শেষ হলেও খেলোয়াড় ক্লাবের হাতেই থাকতেন। লিয়েজ ট্রান্সফার ফি চাইল ১ কোটি ১৭ লাখ ৪৩ হাজার বেলজিয়ান ফ্রাঁ, দ্যুনকের্ক দিতে পারল না। ট্রান্সফার ভেঙে গেল। এরপর লিয়েজ বসম্যানের বেতন পঁচাত্তর শতাংশ কমিয়ে দিল। উনি রাজি না হওয়ায় তাকে বসিয়ে রাখা হলো।
উনি মামলা করলেন। ক্লাবের বিরুদ্ধে, বেলজিয়ান ফেডারেশনের বিরুদ্ধে, উয়েফার বিরুদ্ধে। পাঁচ বছর ধরে মামলা চলল।
১৯৯৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউরোপীয় বিচার আদালত রায় দিল, চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়া খেলোয়াড় কোনো ফি ছাড়াই ইউরোপের যেকোনো দেশে চলে যেতে পারবেন। সঙ্গে বাতিল হলো একাদশে বিদেশি ইউরোপীয় খেলোয়াড়ের সংখ্যার সীমাও।
এক রায়ে ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্য উল্টে গেল। বেকহ্যাম, সল ক্যাম্পবেল, স্টিভ ম্যাকমানামান, সবাই মুক্ত এজেন্ট হয়ে বিশাল চুক্তি করলেন। খেলোয়াড়ের দর বাড়ল, এজেন্টের কমিশন বাড়ল, বেতন আকাশে উঠল।
বসম্যান নিজে এরপর আর কোনো বড় চুক্তি পাননি।
ক্ষতিপূরণের যে টাকা আদালত দিয়েছিল, তার বেশিরভাগ কর আর মামলার খরচে চলে গেল। উনি দেউলিয়া হলেন, বেলজিয়ামের সরকারি ভাতায় চললেন, মদ আর বিষণ্ণতার সঙ্গে বহু বছর কাটালেন। ২০১৩ সালে মারধরের মামলায় তার জেলও হয়।
২০২৫ সালে গোটা পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক ট্রান্সফারে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩১১ কোটি ডলার। ইতিহাসে প্রথমবার অঙ্কটা এক হাজার কোটি ছাড়াল। একই বছর এজেন্টদের হাতে গেছে ১৩৭ কোটি।
আর ২০১৭ সালের ৩ আগস্ট বার্সেলোনার অফিসে যে কাগজে সই হয়েছিল, তাতে ক্রেতার ঘরে পিএসজির নাম নেই। নামটা নেইমারের।
আমি