স্টুটগার্ট, ৫ জুলাই ২০২৪। ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনাল, স্পেন বনাম জার্মানি, ১-১। ঘড়ি ১১৯ মিনিট ছুঁয়েছে, গোটা স্টেডিয়াম টাইব্রেকারের জন্য নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে।
ডান পাশে বল পেলেন ফেরান তোরেস। মাক্সি মিটেলস্টেটকে টপকানোর জন্য ফ্লিক করলেন, আটকে গেলেন, বল উঁচু হয়ে ছিটকে গেল। কারভাহাল কুড়িয়ে নিয়ে মাঠের ওপাশে বাড়ালেন কুকুরেয়াকে।
এই সময়টায় মিকেল মেরিনো কোথায়?
কুকুরেয়ার পায়ে বল পৌঁছানোর আগেই মেরিনো তার সামনে দিয়ে বক্সের কিনারার দিকে দৌড়ে ঢুকে গেছেন। মেরিনো সরে যাওয়ায় কুকুরেয়ার সামনের জায়গাটা খুলে গেল। কুকুরেয়া শট নেওয়ার ভঙ্গি করলেন, তারপর থেমে গিয়ে বাইরের দিকে ওলমোকে দিলেন। ওলমোর ক্রস। মেরিনোর মাথা। গোল! জার্মানি নিজেদের দেশের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল।
হাইলাইটসে যেটা দেখানো হয়, ঐ ক্রস আর ঐ হেড। মেরিনোর প্রথম দৌড়টা কোনো রিপ্লেতে নেই। অথচ গোলটা ওখানেই হয়ে গিয়েছিল।
কোচিংয়ের বইয়ে ছকটা এভাবে আঁকা থাকে। A বল দেয় B-কে, B ফিরিয়ে দেয় C-কে, C ফাঁকা।
এত সহজ যে সন্দেহ হয়। এগারোজনের বিরুদ্ধে এগারোজন। মাঠে কোনো বাড়তি লোক নেই, কেউ লুকিয়ে থাকে না। তাহলে ফাঁকা লোকটা তৈরি হয় কোথা থেকে?
সাধারণভাবে বলা হয়, B-এর দিকে ডিফেন্ডার সরে যাওয়ায় C-এর জায়গা খালি হয়। ঠিক আছে, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ ডিফেন্ডার সরে যাওয়া মানে তো C-এর মার্কারও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারত। সে দাঁড়ায় না। বা দাঁড়ালেও দেরি করে ফেলে।
থার্ড ম্যান আসলে ফাঁকা জায়গা থেকে তৈরি হয় না। তৈরি হয় এক মুহূর্তের ফাঁক থেকে। আর সেই ফাঁকটা তৈরি হয় ডিফেন্ডারের চোখ সরলেই।
১৯৯৯ সালে হার্ভার্ডের দুই মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সাইমন্স আর ক্রিস্টোফার শ্যাব্রি একটা পরীক্ষা চালান। অংশগ্রহণকারীদের একটা ভিডিও দেখানো হলো, ছয়জন মানুষ বাস্কেটবল পাস করছে, তিনজনের গায়ে সাদা জামা, তিনজনের কালো। কাজ একটাই, সাদা দলের পাস গুনতে হবে।
ভিডিওর মাঝখানে গরিলার পোশাক পরা একজন হেঁটে ঢুকল, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বুক চাপড়াল, তারপর বেরিয়ে গেল।
প্রায় অর্ধেক দর্শক গরিলাটা দেখেইনি। গবেষণাপত্রের নাম ‘গরিলাস ইন আওয়ার মিডস্ট’, আর যে প্রবণতার নাম দেওয়া হলো, ওটা ইনঅ্যাটেনশনাল ব্লাইন্ডনেস। মন যেদিকে, চোখ সেদিকেই কানা।
পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নির্দেশনা। মানুষগুলোকে বলা হয়েছিল পাস গুনতে। বল অনুসরণ করার কাজটাই তাদের অন্ধ করেছিল।
ডিফেন্ডারকেও ঠিক ঐ কাজটাই দেওয়া হয়। বল দেখো, ম্যান দেখো, লাইন ধরে রাখো। মানুষের ঘাড় একবার ঘুরতে যে সময় নেয়, ঐ সময়টুকুতে সে কার্যত কিছু দেখে না। প্রথম পাসটা গোলের দিকে যায় না, প্রতিপক্ষের চোখের দিকে যায়।
মহাভারতে জয়দ্রথ বধের দিন কৃষ্ণ সূর্য ঢেকে দিয়েছিলেন। সন্ধ্যা নেমেছে ভেবে জয়দ্রথ আড়াল ছেড়ে সামনে চলে এলেন, অর্জুন তাকে মারলেন। কৃষ্ণের অস্ত্র কোনো তীর ছিল না। ছিল জয়দ্রথের চোখে তৈরি করা একটা ভুল ধারণা।
গার্দিওলার একটা লাইন কোচিং সার্কেলে বহুল উদ্ধৃত। প্রতিপক্ষকে নড়ানোই উদ্দেশ্য, বলকে নয়।
ম্যানচেস্টার সিটির রাইটব্যাক কাইল ওয়াকারকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি টাচলাইনের বদলে সেন্টারব্যাকের এত কাছে ঘেঁষে দাঁড়ান কেন। ওয়াকারের জবাব ছিল, বস তিন মিটারের বেশি লম্বা পাস পছন্দ করেন না, ছোট রাখতে বলেন, যাতে প্রতিপক্ষের ম্যান টেনে আনা যায়।
তিন মিটারের পাসে বল প্রায় কোথাও যায় না। প্রতিপক্ষ যায়।
রন্ডো নিয়েও একই ভুল বোঝাবুঝি চলে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পাসিংয়ের অনুশীলন, বৃত্তের ভেতরে দুইজন তাড়া করছে, বাইরে ছয়জন বল ঘোরাচ্ছে। বল ঘোরানো ওখানে উপলক্ষ। শেখানো হয় কখন প্রতিপক্ষের চোখ সরল, আর ঐ মুহূর্তে সবচেয়ে দূরের লোকটাকে খুঁজে বের করার অভ্যাস।
স্পেনে পজিশনাল প্লের ভাষায় দুইটা আলাদা শব্দ আছে। ওম্ব্রে লিব্রে, মানে ফ্রি ম্যান, প্রেসিংয়ের লাইনের পেছনে যে লোকটা কোনো মার্কার ছাড়া দাঁড়িয়ে আছে। আর তেরসের ওম্ব্রে, থার্ড ম্যান। এই ভাষার কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন হুয়ানমা লিয়ো, স্প্যানিশ কোচ, যাকে গার্দিওলা নিজের শিক্ষক মানেন এবং পরে সহকারী হিসেবে সিটিতে নিয়ে যান। খেলোয়াড় জীবনের শেষদিকে গার্দিওলা মেক্সিকোর দোরাদোসে গিয়েছিলেন শুধু লিয়োর অধীনে খেলবেন বলে, ট্রেনিংয়ে নোটবই নিয়ে হাজির হতেন।
তিনজনের ভেতর সবচেয়ে কম আলোচিত মানুষটা B।
সে বল পায় গোলের দিকে পিঠ দিয়ে, প্রায়ই একজন ডিফেন্ডার তার ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। ঘোরার সুযোগ নেই। তার কাজ এক টাচে বলটা ছেড়ে দেওয়া, এবং ছাড়ার সময় নিজের মার্কারকে নিজের সঙ্গে আটকে রাখা।
মাঠের একমাত্র লোক, যে বল ছোঁয় অথচ বল থেকে কিছুই পায় না।
স্প্যানিশ ফুটবলে এই চালটা ‘পারেদ’ নামে পরিচিত। শব্দের মানে দেয়াল। ইংরেজিতেও ওয়াল পাস। দেয়াল যেমন নিজের জায়গায় থেকে বল ফেরত দেয়, B-এর কাজও অনেকটা তেমন। খেলোয়াড়দের এইটা শেখানো সবচেয়ে কঠিন, কারণ তরুণ মিডফিল্ডাররা বল পেলে ঘুরতে চায়। ঘোরা মানে নিজের দিকে দৃষ্টি টেনে রাখা। কিন্তু B ঘুরে গেলে তার মার্কার মুক্ত হয়ে যায়, আর মুক্ত মার্কার সোজা গিয়ে C-কে ধরে ফেলে।
এইখানে দুইটা টার্ম গুলিয়ে ফেলা হয় প্রায় সবসময়।
থার্ড ম্যান কম্বিনেশন হলো বলের হিসাব। তিনজন খেলোয়াড়, দুইটা পাস, একজন ফ্রি রিসিভার। থার্ড ম্যান এখানে টার্গেট। ফুলহ্যামে কোচিং করানোর সময় স্কট পার্কার বলেছিলেন, তাদের প্রতিটা প্র্যাকটিসের ভেতর দিয়ে থার্ড ম্যান খুঁজে বের করার ধারণা চলতে থাকে, মাসে অন্তত একবার আলাদা সেশন হয়, আর প্রতিপক্ষ প্রেসিং দল হলে সেশনের সংখ্যা বাড়ে।
থার্ড ম্যান রান হলো চোখের হিসাব। এখানে থার্ড ম্যান টার্গেট নাও হতে পারে। সে টোপ। তার শরীর নড়ে বলে ডিফেন্ডারের মনোযোগ নড়ে, আর তার ফেলে যাওয়া জায়গায় অন্য কেউ ঢুকে পড়ে।
ডিফেন্ডারের চোখ নিয়ে একটা শারীরিক সীমাবদ্ধতাও আছে যেটা কোনো ট্রেনিংয়ে কাটে না। কেউ একসঙ্গে বল আর মার্কার দুইটাই দেখতে পারে না, যদি মার্কার তার কাঁধের রেখার পেছনে চলে যায়। এইজন্যই ভালো থার্ড ম্যান রান প্রায় সবসময় ব্লাইন্ড সাইড থেকে আসে, ডিফেন্ডারের পেছনের কাঁধ ঘেঁষে। সামনে দিয়ে দৌড়ালে ডিফেন্ডার দেখে ফেলে। পেছন দিয়ে দৌড়ালে তাকে বেছে নিতে হয়, বল দেখবে নাকি মানুষ।
মেরিনোর গোলটা তাই এত ভালো উদাহরণ। তিনি প্রথমে দৌড়ে জায়গা ফাঁকা করলেন কুকুরেয়ার জন্য, তারপর নিজেই আবার থার্ড ম্যান হয়ে ফিরে এলেন হেডের জন্য। একই খেলোয়াড় এক মুভে দুইটা ভূমিকাই করলেন।
১৯০৮ সালে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী গেয়র্গ জিমেল তার ‘সোৎসিওলগি’ বইয়ে দেখান, দুইজনের সম্পর্ক আর তিনজনের সম্পর্ক আলাদা প্রজাতির। দুইজনের মধ্যে যা ঘটে, ওটা দুইজনেরই। তৃতীয় একজন ঢুকলে কাঠামোটা পাল্টে যায়, এমন কিছু সম্ভব হয় যা দুইজনে কখনো সম্ভব ছিল না।
জিমেল তৃতীয় ব্যক্তির তিনটা চেহারা আলাদা করেছিলেন। মধ্যস্থতাকারী, যে দুইজনকে জোড়া লাগিয়ে রাখে। তেরতিউস গাউদেন্স, লাতিন শব্দবন্ধ, মানে আনন্দিত তৃতীয়, যে অন্য দুইজনের টানাটানি থেকে ফায়দা তোলে। আর ভাগ করো ও শাসন করো, যে তৃতীয়জন ঝগড়াটা নিজে বাধায়।
নর্স পুরাণে বালডারকে মারার সময় লোকি নিজে কিছু ছোঁড়েননি। অন্ধ হোদরের হাতে মিসলটোর ডালটা ধরিয়ে দিয়ে তাক ঠিক করে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর দায় লেখা হলো হোদরের নামে।
ফুটবলের থার্ড ম্যান মুভে লোকির ভূমিকাটা আসলে কার? থার্ড ম্যানের নয়, প্রথম পাসদাতার। সে সবচেয়ে সহজ পাসটা না দিয়ে নিজের দিকে ডিফেন্ডার টেনে আনে, বল হারানোর ঝুঁকি নেয়, অথচ পরিসংখ্যানে তার নাম প্রায় কোথাও থাকে না।
পঞ্চাশের দশকে ইংল্যান্ডে চার্লস রিপ নামে এক লোক ম্যাচ দেখতে দেখতে খাতায় দাগ কাটতেন। পেশায় হিসাবরক্ষক, চাকরি রয়্যাল এয়ার ফোর্সে। ফুটবলের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ডেটা বিশ্লেষক তিনিই।
রিপের হিসাব বলল, প্রায় আশি শতাংশ গোল আসে তিন বা তার কম পাসের মুভ থেকে। উপসংহার টানলেন, বল যত কম পাসে সামনে ফেলা যায় তত ভালো। এফএ-র কোচিং প্রধান চার্লস হিউজ এই ধারণা ইংরেজ ফুটবলের পাঠ্যসূচি বানিয়ে ফেললেন। লম্বা বল, ভাসানো ক্রস, মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া খেলা। এক প্রজন্মের ইংরেজ মিডফিল্ডার নষ্ট হলো।
রিপের আরেকটা হিসাব প্রায় কেউ উদ্ধৃত করে না। তিনি দেখেছিলেন, তার গোনা অর্ধেক গোল এসেছে এক বা শূন্য পাসের মুভ থেকে, অর্থাৎ সেট পিস আর প্রতিপক্ষের ভুল থেকে। এই হিসাবটা তার নিজের তত্ত্বের সঙ্গেই মেলে না, কিন্তু এই দিকটা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি।
গোলমালটা রিপের নিজের খাতাতেই ছিল। তার সংগ্রহ করা মুভের সাড়ে একানব্বই শতাংশই ছিল তিন পাসের বা কম। অথচ গোল এসেছে আশি শতাংশ। মানে ছোট মুভগুলো তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর, বেশি নয়। জোনাথন উইলসন এই হিসাবটা ধরিয়ে দেওয়ার আগে কয়েক দশক কেটে গেছে।
ঠিক ঐ সময়টাতেই পৃথিবীর অন্য পাশে আরেকজন তিন গুনছিলেন, অন্যভাবে।
১৯৬৮ সালে ভালেরি লোবানভস্কি পরিচিত হন আনাতোলি জেলেনৎসভের সঙ্গে, ৭৩ সালে তাকে নিয়ে যান দিনামো কিয়েভে। ওখানে যা বানানো হলো, ওটা কোচিং স্টাফ নয়, ল্যাবরেটরি। জেলেনৎসভ খেলাকে ২২ ধরনের অ্যাকশনে ভাগ করলেন। আর আলাদা করে গুনতে শুরু করলেন যেগুলোকে তিনি বলতেন কোয়ালিশন অ্যাকশন, অর্থাৎ কয়েকজন খেলোয়াড় মিলে করা যৌথ কাজ। লোবানভস্কির কথা ছিল, সাবসিস্টেমের দক্ষতা সবসময় তার আলাদা আলাদা উপাদানের দক্ষতার যোগফলের চেয়ে বেশি।
দুই জায়গাতেই তিন সংখ্যাটা ছিল। ইংল্যান্ডে তিন মানে পাসের সিলিং। কিয়েভে তিন মানে সবচেয়ে ছোট দল।
একই সংখ্যা থেকে দুইরকম ফুটবল বেরিয়েছে, কারণ একদল গুনছিল বল, আরেকদল গুনছিল সম্পর্ক।
আধুনিক ইভেন্ট ডেটায় থার্ড ম্যান রান বের করার চেষ্টা হয় নেটওয়ার্ক তত্ত্বের ট্রায়াডিক ক্লোজার দিয়ে। তিনটা নোড, তিনটা সংযোগ, একটা পাসিং ট্রায়াঙ্গেল। মাঠের এই পাসিং ট্রায়াঙ্গেলের সামাজিক সংস্করণ জিমেল লিখে গিয়েছিলেন ১৯০৮ সালেই।
থার্ড ম্যানের একটা শর্ত আছে, যেটা নিয়ে খুব একটা কথা হয় না। তাকে পাসটা হওয়ার আগেই দৌড় শুরু করতে হয়। বল কোথায় যাবে, তার নিশ্চয়তা তখনও নেই। প্রথম পাসদাতা হয়তো তাকে দেখেইনি, কিংবা দেখেও পাস দেওয়ার সাহস পায়নি। তাই এই দৌড়ের বেশিরভাগই বিফলে যায়। কিন্তু যে খেলোয়াড় বারবার দৌড় নেয়, শেষ পর্যন্ত ফাঁকা জায়গা তার জন্যই তৈরি হয়।
স্টুটগার্টের ঐ রাতে অফিসিয়াল রেকর্ডে দুইটা নাম উঠেছে। অ্যাসিস্টে ওলমো, গোলে মেরিনো। কুকুরেয়া শট না নিয়ে যে সিদ্ধান্তটা নিলেন, তার কোনো হিসাব নেই।
আমি