পহেলা বৈশাখের ভোরে মৃধার হাটে যে চুনের দাগ পড়ে, সেইটা এখন কে টানে, আমরা জানি না। আমরা, মৃধার হাটের দোকানিরা, ফজরের পরে হাটে এসে দেখি দাগ আছে, জামগাছের গোড়া থেকে পুকুরপাড় পর্যন্ত, সরু, সাদা, তাজা, শিশিরে তখনো ভেজে নাই। আমরা দেখি, এবং দেখা শেষ হলে যে যার দোকান খুলে হালখাতার তোড়জোড়ে লেগে যাই। কে টানল, এই প্রশ্ন আমরা করি না। একসময় করার দরকার ছিল না, কারণ আমরা জানতাম।
দাগ টানত নইমুদ্দিন দর্জি।
তেত্রিশ বছর সে টেনেছে। প্রতি বছর, পহেলা বৈশাখের ভোরে। ফজরের আজানের পরপর, যখন হাটের গলিতে আলো বলতে থাকে শুধু মসজিদের বাল্ব আর পুব আকাশের একটু ফিকা ভাব, তখন সে আসত। ছোটখাটো মানুষ, ধোয়া পাঞ্জাবি, কাঁধে গামছা, এক হাতে গোলা চুনের টিনের কৌটা, আরেক হাতে বাঁশের কঞ্চি, কঞ্চির মাথায় ন্যাকড়া বাঁধা। সে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটত আর দাগ টানত। তাড়াহুড়া করত না। মাঝে মাঝে সোজা হয়ে কোমরে হাত দিয়ে দম নিত, তারপর আবার ঝুঁকত। পুরা দাগ টানতে তার লাগত এক ঘণ্টার মতো। তারপর সে পুকুরপাড়ে কৌটাট ধুয়ে, গামছায় হাত মুছে, যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে চলে যেত। এক বেলা পরেই দুপুরের ভেতর হাজার পায়ের তলায় সে দাগ মুছে যেত। এদিকে আমরা জানতাম, সামনের বৈশাখের আগে সে আর আসবে না।
দাগের রাস্তা আমরা সবাই মুখস্থ জানি। জামগাছের গোড়া থেকে সোজা পুবে, মাছবাজারের চালার নিচ দিয়ে, তিন দোকানের পাটাতন ঘেঁষে, তারপর কাপড়পট্টির মাঝখান দিয়ে, তারপর মজিদের মুদিদোকানের ভেতর দিয়ে, সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে, শেষে পুকুরপাড়ের ভাঙা ঘাটলায় গিয়ে দাগ থামত। দেড়শ হাতের মতো লম্বা। এই দেড়শ হাত একসময় ছিল একটা ভিটার উত্তরের সীমানা। ভিটা ছিল নইমুদ্দিনের বাপ সদর আলীর।
ভিটা কীভাবে মৃধাদের হলো, তা নিয়ে হাটে তিন রকম কথা চালু আছে। কেউ বলে, চুয়াত্তরের আকালে সদর আলী ভিটা বন্ধক রেখেছিল সমশের মৃধার কাছে, বিনিময়ে নিয়েছিল বারো মণ ধান, আর যে কাগজে সে টিপসই দিয়েছিল সেটা বন্ধকের কাগজ ছিল না, ছিল বিক্রির দলিল, পড়তে জানলে সে ধরতে পারত। কেউ বলে, কাগজ পরে বানানো, জাল, আসল বন্ধকনামা মৃধার সিন্দুকে পচেছে। আর কেউ কেউ বলে, সদর আলী সত্যিই বেচেছিল, আকালের বছর মানুষ কী না বেচে, পরে ছেলের কাছে বলতে লজ্জা পেয়ে বন্ধকের গল্প বানিয়েছিল।
যেটা চলে না সেটা হলো ভিটা। ভিটার উঠানে প্রথমে বসল সপ্তাহে দুই দিনের হাট, তারপর উঠল টিনের চালা, তারপর ইটের দোকানঘর, সারি সারি, আর সমশের মৃধার নামে হাটের নাম হয়ে গেল মৃধার হাট। ভিটার ঘরদুয়ারের কিছু থাকল না, থাকল শুধু জামগাছ, মাছবাজারের মাথায়, আর পুকুর, যেটায় এখন হাটের লোক হাত ধোয়। জামগাছ কাটার কথা উঠেছিল শুরুতেই। কাটা হয় নাই। কেন হয় নাই, তা নিয়েও দুই রকম কথা আছে। কেউ বলে মৃধা নিজে বলেছিল, থাক, ছায়া দিব। আর কেউ বলে, করাত ঠেকানোর পর মিস্ত্রির হাত থেকে করাতটা পড়ে গিয়েছিল, দুইবার, আর তৃতীয়বার মিস্ত্রি আর হাত লাগায় নাই।
মামলা চলেছিল বারো বছর। সদর আলী মামলা চালাতে চালাতেই মরল, নইমুদ্দিন চালাল বাকিটা। ততদিনে সে শহরে গিয়ে দর্জির কাজ শিখে ফেলেছে, কারণ জমি গেলে মানুষ যা হয়, সে তা-ই হয়েছিল, আর রেলগেটের কাছে টিনের একচালায় সে মেশিন বসিয়েছিল। রায় হলো এরশাদ সাহেবের আমলে। নইমুদ্দিন হারল। কেন হারল, সেই কথাও আমাদের কাছে তিন রকম করে আছে। কেউ বলে তার এক নম্বর সাক্ষী, ভিটার পুরানা আমিন, রায়ের আগের হপ্তায় মরে গিয়েছিল। কেউ বলে উকিল কেনা ছিল। আর কেউ বলে কেনাবেচার দরকারই পড়ে নাই, কাগজ যার, জমি তার, আইন এই কথার বাইরে যাইতে পারে না। রায়ের দিন নইমুদ্দিন কোর্টের বারান্দায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর বাড়ি গিয়েছিল, কারো সঙ্গে কথা বলে নাই। তারপর শীত গেল। সে রেলগেটে বসে কাজ করল, ঈদের জামা, ইস্কুলের প্যান্ট, বিয়ের শেরওয়ানি, আর আমরা ধরে নিলাম, ব্যাপারটা এইখানে শেষ। মাঘের দিকে একদিন সে হাটে এসে মজিদের দোকান থেকে আধা সের চুন কিনে নিয়ে গিয়েছিল, আর এই নিয়েও আমরা কিছু ভাবি নাই। চুন মানুষ কত কাজেই কেনে। পান খাওয়া, ঘর লেপা।
পরের পহেলা বৈশাখের ভোরে হাটে ঢুকে আমরা দেখলাম, মাটিতে সাদা দাগ।
প্রথম বছর আমরা বুঝি নাই কী হইতেছে। কেউ ভাবল পৌরসভার মাপজোক, কেউ ভাবল ডেকোরেটরের কাজ, হালখাতার সাজ। তারপর মাছবাজারের কালাম দেখল, জামগাছের গোড়ায় বসে একটা লোক টিনের কৌটায় কঞ্চি ডুবাচ্ছে, আর লোকটা নইমুদ্দিন। খবর গেল সমশের মৃধার কাছে। মৃধা এল, চেয়ার আনানো হলো, সে চেয়ারে বসে দাগ টানা দেখল, তারপর হাসল, অনেকক্ষণ ধরে হাসল, এবং হাসি থামিয়ে দোকানের ছেলেটাকে বলল, এক কাপ চা দে তো ওনারে। নইমুদ্দিন দাগ থামিয়ে সোজা হলো, চায়ের কাপটা নিল, খেল, কাপ ফেরত দিয়ে বলল, স্লামালিকুম মৃধা সাব। তারপর আবার ঝুঁকে বাকি দাগ টানল। মৃধার হাসি কখন থেমেছিল আমরা খেয়াল করি নাই, খালি খেয়াল করেছিলাম, চেয়ারটা অনেকক্ষণ খালি পড়ে ছিল, মৃধা উঠে গেছে।
দ্বিতীয় বছর মৃধা তিনজন কামলা লাগাল দাগ মোছার জন্য। বালতির পানি, চটের ন্যাতা, ঝাড়ু। মুছতে গিয়ে দেখা গেল ভেজা চুন লেপটে যায়, দাগ মোছে না, চওড়া হয়, দেড়শ হাতের সরু দাগ দুপুরের মধ্যে হয়ে উঠল দেড়শ হাতের সাদা রাস্তা, আর হাটের লোক সেই রাস্তা ডিঙায়ে ডিঙায়ে হাঁটতে লাগল, যেন পার হইতেছে। তৃতীয় বছর থেকে মোছার হুকুম আর হয় নাই।
তৃতীয় বছর মৃধা থানায় খবর দিল। সেই বৈশাখে দারোগা নিজে এল, সঙ্গে দুই কনস্টেবল, আর জামগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে তারা পুরা দাগ টানা দেখল। মাঝপথে দারোগা জিজ্ঞেস করল, এই যে মিয়া, করতেছেন কী? নইমুদ্দিন না থেমে বলল, দাগ দেই। কীসের দাগ? চুনের। দারোগা আর কথা বাড়াল না। দাগ শেষ হলে সে মজিদের দোকানে বসে চা খেল, বিস্কুট খেল, তারপর থানায় ফিরে গেল, আর কোনো কাগজে কিছু লেখা হলো না। আমরা পরে শুনেছি, ধারা পাওয়া যায় নাই। মানুষের নামে মামলা হয়, চুন দাগের নামে মামলা হয় না।
তারপরের বছর মৃধা ভোররাত থেকে জামগাছতলায় চারজন লোক দাঁড় করিয়ে রাখল, লাঠি হাতে। নইমুদ্দিন এল, চারজনকে সালাম দিল, তারপর গাছ থেকে হাত দশেক দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল, কৌটা হাতে, কঞ্চি হাতে। আলো ফুটতে লাগল, হাটে লোক জমতে লাগল, আর জমা লোকগুলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল, লাঠি হাতে চারজন জোয়ান একজন বুড়া দর্জিকে পাহারা দিচ্ছে, আর বুড়া দর্জি কিছুই করছে না, খালি দাঁড়িয়ে আছে। পাহারা জিনিসটা বেশিক্ষণ দেখানোর জিনিস না। দুপুরের আগে চারজনের একজনও আর গাছতলায় ছিল না, আর সেই বছর দাগ পড়েছিল দেরিতে, ভরদুপুরে, হাটসুদ্ধ লোকের চোখের সামনে। মৃধা আর কোনোদিন পাহারা বসায় নাই।
তারপর বছরের পর বছর গেল, আর দাগ আমাদের সনের হিসাবে ঢুকে গেল। চৈত্র ফুরায়, হালখাতার কার্ড ছাপা হয়, দোকানে দোকানে রঙের কাজ, আর আমরা জানি, পয়লা তারিখ ভোরে দাগ পড়বে। নইমুদ্দিন আসত, দাগ টানত, আর যে দোকানের ভেতর দিয়ে বা গা ঘেঁষে দাগ যেত, সেই দোকানির সঙ্গে দুইটা কথা বলত। স্লামালিকুম। ব্যবসাপাতি ভালা তো? এই দুইটাই। উত্তরে কী বলতে হয় আমরা প্রথম প্রথম জানতাম না, পরে শিখে গেছি। ভালা, চাচা। আপনে ভালা? সে মাথা নাড়ত, আর দাগ টানতে টানতে আগায়ে যেত। মজিদের মুদিদোকানের ভেতর দিয়ে দাগ যেত বলে মজিদের সঙ্গে তার খাতির ছিল সবচেয়ে পুরানা, যদিও খাতির কথাটা ঠিক না, জিনিসটার কোনো নাম আমরা দিতে পারি নাই। চৈত্রসংক্রান্তির রাতে মজিদ তার চালের বস্তাগুলি ডান দিকে সরিয়ে রাখত, মাঝখান খালি করে, ঝাড়ু দিয়ে। কেন, জিজ্ঞেস করলে বলত, বছর শেষ, দোকান ঝাড়ি, আবার কী। আর মজিদের দোকানের পাকা মেঝেতে, বছরের পর বছর চুন খেয়ে খেয়ে, দাগের স্থায়ী ছায়া বসে গিয়েছিল, ফিকা, সাদাটে। মুছত না, শীত-বর্ষা কিছুতেই না। হাটের দেড়শ হাত দাগ বাঁচত এক বেলা, খালি মজিদের দোকানের ভেতরের সাত হাত বাঁচত সারা বছর।
আর ছিল এক বুড়া, ভিটার আমলের প্রতিবেশী, নাম আমরা কেউ ঠিকমতো জানতাম না, নদীর ওই পারের চরে থাকত। প্রতি বছর পয়লা তারিখ সকালে সে হাটে আসত, কিছু কিনত না, দাগের এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত একবার হেঁটে যেত, আস্তে আস্তে, যেন মাপ মিলিয়ে দেখছে, তারপর ঘাটলায় খানিক বসে নৌকা ধরে ফিরে যেত। কী দেখতে আসত, কার জন্য আসত, জিজ্ঞেস করা হয় নাই। যত বছর গেছে তার হাঁটা তত ধীর হয়েছে, তারপর এক বছর থেকে সে আর আসে নাই।
মাছবাজারে একবার নতুন এক দোকানি এল, বরিশালের লোক, যার পাটাতন পড়ল ঠিক দাগের রাস্তার উপর। সংক্রান্তির রাতে তাকে বলা হলো পাটাতন একটু সরিয়ে রাখতে। সে রাজি হলো না। কার জমি, কার দাগ, আমার দোকানের ভিতর দিয়া কিছু যাইব না। পরদিন ভোরে নইমুদ্দিন দাগ টানতে টানতে পাটাতনের কাছে এসে থামল। তারপর পাটাতনের এই মাথা পর্যন্ত দাগ টেনে, উঠে দাঁড়িয়ে, ওই মাথার ওপাশে গিয়ে আবার শুরু করল। সেই বছর দাগের মধ্যে হাত পাঁচেকের একটা ফাঁক থাকল, আর আশ্চর্যের কথা, দেড়শ হাত দাগের চেয়ে ওই পাঁচ হাত ফাঁকই লোকের চোখে পড়ল বেশি। সারা দিন লোক মাছ কিনতে এসে পাটাতনের দিকে তাকাল, কিছু বলল না, তাকাল। পরের বছর সংক্রান্তির রাতে বরিশালের লোকটা নিজেই পাটাতন সরিয়ে জায়গাটা ঝাড়ু দিয়ে রাখল। তাকে দ্বিতীয়বার কেউ কিছু বলে নাই।
এর মধ্যে হাটে একটা কথা চালু হয়ে গিয়েছিল, কে চালু করেছিল জানা যায় নাই। কথাটা এই যে, দাগ যেই দোকানের ভিতর দিয়া যায়, সেই দোকানে বরকত হয়। মজিদের বেচাবিক্রি ভালো, এইটা সত্য, তবে মজিদের বেচাবিক্রি দাগের আগেও ভালো ছিল কি না, সেই হিসাব আর কারো মনে ছিল না। ফল হলো এই, নতুন দোকান তোলার সময় লোকে খোঁজ নিত দাগের রাস্তা কোন দিক দিয়া গেছে, আর দাগের গায়ের পজিশনের ভাড়া উঠল বাকি হাটের চেয়ে বেশি। যেই দাগ টানা হয়েছিল হাটের বিরুদ্ধে, সেই দাগ হাটের ভাড়া বাড়িয়ে দিল, আর এই কথা নইমুদ্দিন জানত কি না, জানলে কী ভাবত, আমরা জানি না।
এরশাদ পতনের বছর হরতালে দেশ অচল, হাটও বন্ধ, ঝাঁপের পর ঝাঁপ ফেলা। সেই বৈশাখে দাগ পড়েছিল একদম খালি হাটে। কেউ দেখে নাই, কেনার লোক নাই, বেচার লোক নাই, মাড়ানোর পা নাই। বিকালে দুই-একজন ঝাঁপ ফাঁক করে দেখল, দাগ পড়ে আছে আস্ত, ঝকঝকা, পড়ন্ত আলোয় সাদা। তেত্রিশ বছরে ওই একবারই দাগ সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচেছিল।
আর কবে কী হয়েছিল, সেই হিসাবও আমরা একসময় দাগ দিয়েই রাখা শুরু করলাম। কাপড়পট্টির আগুন কোন বছর? যেই বছর দাগ পড়ে নাই। বরিশালের লোকটা আসছিল কবে? ফাঁকওয়ালা দাগের বছর। কার বিয়া, কার দোকান তোলা, কার বাপ মরা, সব কিছুর গায়ে আমরা দাগের বছর লাগিয়ে দিলাম, বাংলা সনের পাশে আমাদের নিজেদের আরেকটা সন, যেই সনের পয়লা তারিখ শুরু হইত ফজরের আজানের পরপর, এক বুড়া দর্জির হাতে।
নইমুদ্দিনকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিল আমাদের একজনই, কাপড়পট্টির হাসমত, সেও অনেক বছর পরে, সাহস করে। চাচা, দাগ দিয়া কী অইব? জমি তো আর ফিরত পাইবেন না। নইমুদ্দিন দাগ থামায় নাই, ঝুঁকে থেকেই বলেছিল, জমি চাই না রে বাজান। খালি দেহি, মাপটা ভুলছি কি না।
এই কথা হাটে ছড়িয়েছিল, এবং ছড়িয়ে কিছু একটা হয়েছিল, যেটা আমরা টের পেয়েছি আরো পরে। কথাটা শোনার পর থেকে দাগটাকে আর কারো দখলের চেষ্টা মনে হইত না। মনে হইত পড়া মুখস্থ রাখার মতো কিছু, নামাজের মতো কিছু, যেটা একজন মানুষ করে, কারণ না করলে সে আর সে থাকে না। আর যে জিনিস দখলের না, সেই জিনিসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় না। মৃধা এই কথা বুঝেছিল কি না আমরা জানি না। বুঝলে তার কষ্টই হওয়ার কথা, কারণ দখল ঠেকানো যায়, মুখস্থ ঠেকানোর কোনো রাস্তা আদালতেও নাই।
বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন নইমুদ্দিন ছিল রেলগেটের দর্জি। ভালো দর্জি। হাটের দোকানিদের পাঞ্জাবি, তাদের পোলাপানের ইস্কুলের জামা, ঈদের আগে রাত জেগে সেলাই, সবই সে করত, ন্যায্য মজুরিতে, এবং কাপড়ে চক দিয়ে দাগ টানার সময় তার হাত এত সোজা চলত যে মনে হইত স্কেল লাগে নাই। মৃধাবাড়ির কাজও সে ফেরায় নাই। সমশের মৃধার নাতনির ইস্কুলের ফ্রক তার হাতের সেলাই, এই কথা মৃধাবাড়ির লোকেও লুকায় নাই, সে-ও লুকায় নাই। সুতার হিসাব আর মাটির হিসাব সে আলাদা খাতায় রাখত, এইটুকু আমরা বুঝতাম, পুরা বুঝতাম না।
তার ছেলে বড় হয়ে ট্রাকের ব্যবসায় ঢুকেছিল, দূরপাল্লার লাইনে, আর মৃধার হাটে সে জীবনে পা দেয় নাই। বাপের দাগের কথা উঠলে সে মুখ ফিরিয়ে নিত। একবার, রেলগেটের দোকানে বসে, সে বলেছিল, আব্বা, আর যায়েন না। মাইনষে আপনেরে পাগল কয়। নইমুদ্দিন তখন মেশিনে একটা জামার হাতা তুলছিল, প্যাডেল থামে নাই, সুতা কাটার সময় শুধু বলেছিল, কউক। ছেলে আর কোনোদিন কথা তোলে নাই।
মাঝখানে এক বছর দাগ পড়ে নাই। সেই চৈত্রে নইমুদ্দিনের বউ মরল, আর বৈশাখের ভোরে জামগাছের গোড়া খালি পড়ে থাকল। আমরা কেউ কেউ বেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম, তারপর যে যার হালখাতায় ঢুকে গিয়েছিলাম। সেই বছরই আষাঢ়ে কাপড়পট্টিতে আগুন লাগল, সাতটা দোকান পুড়ল, হাসমতেরটা সুদ্ধা। আগুনের সঙ্গে দাগের কোনো সম্পর্ক নাই, এই কথা আমরা সবাই জানতাম, এবং জানতাম বলেই কেউ মুখে আনি নাই, কারণ যেই কথার সম্পর্ক নাই, সেই কথা মুখে আনলে সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। শুধু পরের বছর চৈত্রসংক্রান্তির রাতে দেখা গেল, কাপড়পট্টির নতুন দোকানগুলির সামনে সবাই ঝাড়ু দিয়ে রেখেছে, আর পয়লা তারিখ ভোরে আমাদের অনেকে ফজরের আগেই হাটে এসে বসে আছে, চা খাচ্ছে, আর জামগাছের দিকে তাকিয়ে আছে। নইমুদ্দিন এল, ঝুঁকল, দাগ টানল। আমরা দেখলাম, তারপর ঘরে গিয়ে ঘুম দিলাম। কী দেখলাম, কেন দেখলাম, এই আলাপ আমাদের মধ্যে হয় নাই।
এক বছর বৈশাখের ভোরে নামল বৃষ্টি। ভেজা মাটিতে চুন ধরে না, এই কথা কারিগরের চেয়ে ভালো কে জানে। নইমুদ্দিন জামগাছের তলায় দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ আকাশ দেখল। তারপর বৃষ্টির মধ্যেই দাগ টানা শুরু করল। সে টানছিল, আর তার হাত দশেক পিছনে বৃষ্টি দাগ ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। জামগাছ থেকে পুকুরপাড় পর্যন্ত সে পুরাটা টানল, একবারও পিছনে তাকাল না, আর আমরা চালার নিচে দাঁড়িয়ে দেখলাম, একটা মানুষ দেড়শ হাত লম্বা দাগ টেনে গেল, যেই দাগ কোথাও নাই। ঘাটলায় গিয়ে সে কৌটা ধুলো, যদিও ধোয়ার কিছু ছিল না। সেই বছরের দাগ আমরা কেউ চোখে দেখি নাই, অথচ ওই বছরেরটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি মনে আছে।
তার হাত কাঁপা শুরু হয়েছিল শেষের দশ-বারো বছরে। এক বছর কাপড়পট্টির মোড়ে এসে তার কৌটার চুন ফুরিয়ে গেল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, আর মজিদ নিজের দোকান থেকে আধা সের চুন এনে কৌটায় ঢেলে দিল। নইমুদ্দিন দাম দিতে চাইল, মজিদ নিল না, আর পরের হাটবারে মজিদের ছেলের দুইটা পাঞ্জাবির মজুরি নইমুদ্দিন নেয় নাই। এই লেনদেনের কথা তারা কেউ কাউকে বলে নাই, আমরা জেনেছি, কারণ হাটে কোনো কথা চাপা থাকে না। আর তার পরের বছর থেকে হাট কমিটির খরচের খাতায় একটা লাইন উঠল। ডেকোরেটর, মিষ্টি, চা-পানির নিচে, ছোট করে: চুন বাবদ, দশ টাকা। কে লিখল, কার হুকুমে লিখল, কমিটির কোন মিটিংয়ে পাস হলো, এইসব কিছুই আমরা জানি না। খাতায় জিনিস একবার উঠলে আর নামে না, এইটুকু জানি।
শেষ দিকে তার দাগ একটু বাঁকা পড়ত। হাত কাঁপত, কোমর আর আগের মতো ঝুঁকত না, আর জামগাছ থেকে পুকুর পর্যন্ত লাইনে ঢেউ খেলত। নতুন দোকানদাররা, যারা মামলার কথা জানে না, সদর আলীর নামও শোনে নাই, তারা কেউ ভাবত দাগটা পৌরসভার, কেউ ভাবত হালখাতার নিয়ম, বৈশাখের সাজ। এক বছর ইস্কুলের বৈশাখী মিছিল হাটের ভেতর দিয়ে গেল, বাচ্চারা মুখোশ পরা, হাতে কাগজের মাছ, আর তারা দাগ পেয়ে দাগ ধরে ধরে হাঁটতে লাগল, লাইন করে, খেলার মতো। নইমুদ্দিন কঞ্চি হাতে এক পাশে দাঁড়িয়ে পুরাটা দেখল। তারপর মিছিল চলে গেলে বাচ্চাদের পায়ে মুছে যাওয়া জায়গাগুলিতে আবার চুন বুলিয়ে সে বাকি দাগ টানল। সেদিন তাকে দেখে আমাদের কারো কারো মনে হয়েছিল, বাঁকা দাগই ঠিক আছে। পুরানা ভিটার সীমানা কি আর সোজা থাকে।
পুরানা দোকানিদের মধ্যে অবশ্য দাগের রাস্তা নিয়া তর্ক ছিল। কেউ বলত, প্রথম দিকের দাগ মাছবাজারের কাছে আরো উত্তর ঘেঁষে যেত, নইমুদ্দিন পরে সুবিধামতো সোজা করে নিয়েছে। কেউ বলত, দাগ একচুলও সরে নাই, সরেছে হাট, দোকান ভাঙে, নতুন দোকান ওঠে, চালা আগায়, পাটাতন পিছায়, তেত্রিশ বছরে হাটই কয় হাত হেঁটে গেছে তার ঠিক নাই। এই তর্কের মীমাংসা হয় নাই। শুধু কথাটা আমাদের মনে ধরেছিল। হইতেও পারে। দাগ ঠিকই আছে, আমরাই নড়তেছি।
সমশের মৃধা মরেছে তারও আগে। জানাজায় হাট ভেঙে পড়েছিল, এবং শেষ কাতারে, চাদর গায়ে, নইমুদ্দিন দাঁড়িয়ে ছিল। নামাজ শেষে সে কারো সঙ্গে কথা না বলে চলে গিয়েছিল, আর এই নিয়ে হাটে যে যার মতো কথা বানিয়েছিল, সে ক্ষমা করতে আসছিল, সে দেখতে আসছিল, সে হিসাব মিলাইতে আসছিল। তিনটাই চালু আছে। মৃধার নাতি এখন হাটের মালিক, ঢাকায় পড়া ছেলে, সে একবার জামগাছ কেটে ওইখানে দোতলা মার্কেটের কথা তুলেছিল, আর আপত্তি এসেছিল আমাদের কাছ থেকেই, মাছবাজারের দোকানিদের কাছ থেকে। ছায়া যাইব, আমরা বলেছিলাম। গাছ থাকল। কী থাকল, সেই হিসাব আমরা করি নাই।
নইমুদ্দিন মরল মাঘ মাসে, ঘুমের ভেতর, রেলগেটের সেই একচালায়, মেশিনের পাশের চৌকিতে। জানাজার দিন মৃধার হাটের দোকান বন্ধ ছিল আধাবেলা। যে মানুষের নামে হাটের এক ছটাক জমিও ছিল না, তার জন্য হাট বন্ধ হলো, এই কথা আমরা সেদিন কেউ উচ্চারণ করি নাই, শুধু শাটার নামাতে নামাতে আমরা টের পাচ্ছিলাম, হিসাবের ভেতরে কোথায় যেন গরমিল, কোন খাতে ফেলা যায় না। রেলগেটের একচালা ঘর তার ছেলে ভাড়া দেয় নাই, মেশিনও বেচে নাই। কেন, জিজ্ঞেস করলে বলে, সময় পাই না। মেশিন কাপড়ে ঢাকা পড়ে আছে, এই পর্যন্ত আমরা জানি।
তারপর চৈত্র এল। সংক্রান্তির রাতে কাপড়পট্টির লোকেরা অভ্যাসমতো ঝাড়ু দিল, দিয়ে নিজেরাই থমকে গেল, কার জন্য দিলাম। মজিদ তার চালের বস্তা ডানে সরাল, মাঝখান খালি করল, আর দোকানের সামনে চুনের কৌটা ভরে রেখে দিল, কঞ্চিসুদ্ধা। কেন রাখল, জিজ্ঞেস করা হয় নাই। পয়লা তারিখ ভোরে আমরা হাটে ঢুকলাম, এবং জামগাছের গোড়া থেকে পুকুরপাড় পর্যন্ত, মাছবাজারের চালার নিচ দিয়ে, কাপড়পট্টির মাঝখান দিয়ে, মজিদের খোলা দোকানের ভেতর দিয়ে, দাগ পড়ে আছে। সরু, সাদা, তাজা। আগের মতো একটু বাঁকা।
কে টানল? কেউ বলে, ভোররাতে কুয়াশার ভেতর এক লোককে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটতে দেখা গেছে, লম্বা না বাইটা, তা বোঝা যায় নাই, কুয়াশায় মানুষের মাপ থাকে না। কেউ বলে, নইমুদ্দিনের ছেলের সাইকেল সেই ভোরে রেলগেটে দাঁড় করানো ছিল, যেই ছেলে জীবনে কোনোদিন মৃধার হাটে পা দেয় নাই, বাপের দাগকে পাগলামি বলত। ছেলেকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, ছেলে বলেছিল, আমি ঘুমে আছিলাম। দ্বিতীয়বার আর কেউ জিজ্ঞেস করে নাই। কেউ বলে, মজিদের কৌটা সকালে আধা খালি পাওয়া গেছে, আর কঞ্চির ন্যাকড়া ভেজা। আর কেউ কেউ বলে, কেউ টানে নাই, দাগ এখন নিজেই জানে কোথা দিয়ে যেতে হয়, তেত্রিশ বছরে মাটিরও মুখস্থ হয়ে যায়।
সেই থেকে প্রতি বছর দাগ পড়ে। আমরা কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করি না কে টানে। না করার কারণ আমরা প্রত্যেকে জানি, নিজের নিজের মতো করে। আমাদের প্রত্যেকের ধারণা, প্রশ্ন তুললে বাকি সবাই আমার দিকেই তাকাবে।
খালি একটা জিনিস বদলায় নাই। প্রতি বছর হালখাতার পরে কমিটির খরচের খাতা লেখা হয়, ডেকোরেটর, মিষ্টি, মাইক, চা-পানি, আর তার নিচে ছোট করে ওঠে, চুন বাবদ, বিশ টাকা। গত বছর নতুন ক্যাশিয়ার ছেলেটা কলম থামিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, চুন কীসের?
আমরা বলেছিলাম, লেইখা যাও।
সে লিখেছিল।
আমি