সকালে বারান্দায় বেরিয়ে আফসার সিদ্দিক দেখে, দড়িতে ঝোলানো নীল শার্ট ভিজে গেছে। রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। শার্টটা চার দিন ধরে ওখানেই ঝুলছে। রেজাউল করিম শার্ট তোলে না।
আফসার কাপড় ধরে দেখে। কাঁধের কাছে ছাতা পড়েছে। সে হাত সরিয়ে নেয়, লুঙ্গিতে আঙুল মোছে। রেজার দরজা ভেজানো। ভেতরে সাড়া নাই।
এই টিনের দোতলায় ঘর ছয়টা। সামনে সরু বারান্দা, এক মাথায় আফসারের ঘর, অন্য মাথায় রেজার। মাঝের চারটা ঘরে গার্মেন্টসের মেয়েরা থাকে। তারা ছয়টার আগে বের হয়, রাত দশটার পর ফেরে। দিনের বেলা এই বারান্দায় কেউ থাকে না। আফসার নীলক্ষেতে বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ করে, সকাল আটটায় বের হয়, রাত নয়টায় ফেরে। ফিরে সে শার্টটা দেখে। একই জায়গায় থাকে।
কাটাসুরের এই গলিতে রেজাউল করিম চোদ্দো বছর ধরে আছে। ভোলা থেকে এসে সে মিরপুর এক নম্বরে হারুন সাহেবের টাইলসের দোকানে ঢুকেছিল, নয় বছর ছিল সেখানে। তারপর দোকানের মালিকানা বদলায়। রেজার কাজ থাকে না। এরপর দুই বছর সে কী করত, গলির লোকে ঠিক বলতে পারে না। সকালে বের হতো, বিকালে ফিরত, হাতে একটা পলিথিন থাকত কখনো কখনো। কী কাজ, জিজ্ঞেস করলে রেজা গলা পরিষ্কার করত দুইবার, তারপর বলত, দেখতেছি।
দেখতেছি ছিল রেজার কথা। ঘরভাড়া নিয়ে বাড়িওয়ালা আবু তাহের তাগাদা দিলে রেজা বলত, দেখতেছি। সোবহানের দোকানে বাকি জমলে সোবহান চুপ করে খাতার দিকে তাকিয়ে থাকত, রেজা বলত, দেখতেছি। দুই বছর আগে আফসার তাকে চার হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। কীসের জন্য, সেটা আর মনে নাই। টাকা ফেরত আসে নাই। আফসার কোনোদিন চায় নাই, রেজাও কোনোদিন বলে নাই।
লোকে রেজাকে খারাপ বলত না। খারাপ বলার মতো কিছু সে করে নাই। লোকে শুধু তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় একটু তাড়াহুড়া করত, যেন কথা শেষ করে সরে যাওয়া দরকার।
জ্যৈষ্ঠ মাসের এক দুপুরে গলির মুখে একটা রিকশা থামে। যে লোক নামে, তার কাঁধে ব্যাগ, হাতে মাটির হাঁড়ি, হাঁড়ির মুখে কাগজ বাঁধা। ভোলা থেকে এসেছে। নাম আলাউদ্দিন। রেজার বোন রাহেলার স্বামী।
আফসার তখন দোকানে। সে ফিরে এসে শোনে, আলাউদ্দিন সারা দুপুর রেজার ঘরে বসে ছিল, নতুন গুড় দিয়ে গেছে, চা খেয়ে গেছে, বিকালের গাড়িতে ফিরে গেছে। মরিয়ম, নিচতলার সেলাইয়ের কাজ করা মেয়েটা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আফসারকে বলে, ভাই, রেজা ভাইয়ের ভাইগ্না নাকি স্কুলে ভর্তি হইছে। রেজা ভাই টাকা পাঠাইছে।
আফসার বলে, কে কইছে?
ওই লোকে কইল। বারবার শুকরিয়া কইতাছিল।
আফসার রেজার দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। রেজা মেঝেতে বসে আছে, পিঠ দেয়ালে। হাঁড়িটা কোণায়। কাগজ খোলা হয় নাই।
আফসার বলে, শালা আসছিল?
রেজা মাথা নাড়ে।
টাকা পাঠাইছেন?
রেজা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, আমি টাকা পাঠাই নাই।
আফসার হাসে। বলে, ভালো। পাঠাইলেও কইতেন না।
রেজা তখন আফসারের দিকে তাকায়। ওই তাকানো আফসারের মনে থেকে যায়, যদিও তখন সে গুরুত্ব দেয় না। মানুষ যখন কোনো কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারে কথা বললে অবস্থা আরও খারাপ হবে, তখন সে ওভাবে তাকায়।
গুড়ের হাঁড়ি কোণায় থেকে যায়। এগারো দিন পর মরিয়ম দেখে, দেয়াল বেয়ে পিঁপড়ার সরু লাইন হাঁড়ির মুখ পর্যন্ত উঠে গেছে। লাইন ভাঙে না। মরিয়ম ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে দেয়, পরদিন লাইন আবার ঠিক একই জায়গা দিয়ে ওঠে।
সোবহানের দোকানে সন্ধ্যাবেলা বেঞ্চে লোক বসে। বৃষ্টির দিনে ত্রিপল ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, ভেতরে ভাপ জমে। সেই বেঞ্চেই আফসার প্রথমবার শোনে।
ফরিদের হাতে মোবাইল। ফরিদ বাসের হেলপার ছিল, এখন গলির মাথায় ভ্যানে তরকারি বেচে। সে মোবাইল বেঞ্চের ওপর রাখে, একটা বোতাম চাপে।
প্রথমে খুকখুক করে গলা পরিষ্কার করার শব্দ। দুইবার। তারপর বলে, ফরিদ ভাই, খাইছেন? আইজকা বৃষ্টি অইব মনে হয়। মালটা ঢাইকা রাইখেন।
বেঞ্চে বসা লোকেরা কেউ চমকায় না। সোবহান চুলার দিকে ঝুঁকে থাকে। একজন বলে, রেজা ভাই এহন খোঁজখবর নেয়।
আফসার বলে, কবে পাঠাইছে?
কাইল রাইতে।
কয়টায়?
ফরিদ মোবাইল দেখে বলে, দুইটা চল্লিশ।
আফসার কিছু বলে না। কাল রাত দুইটার সময় সে বারান্দায় বেরিয়েছিল, পানি খেতে। রেজার ঘরে বাতি ছিল না। রেজার ঘরে গত এক মাসে রাতে বাতি জ্বলে নাই।
পরে যখন এই সব নিয়ে গলিতে কথা হবে, একজন বলবে ওই রেকর্ডিংয়ে পেছনে কুকুরের ডাক শোনা গেছিল। আরেকজন বলবে সেটা এই গলিরই কুকুর, কালা কুত্তা, ঘেউয়ের শেষে যেটা কাশির মতো শব্দ করত। কালা কুত্তা রোজার মাসে মরে গেছে, ময়লার গাড়ি নিয়া গেছে। এই নিয়ে কেউ তর্ক করে না। ফরিদ মোবাইল থেকে মুছে ফেলেছিল, জায়গা ছিল না।
আফসারের ঘরে সেই রাতে টিনের ওপর বৃষ্টি পড়ে। তার মেয়ে তুলি ক্লাস নাইনে পড়ে, ঘুমাচ্ছে। তার স্ত্রী নাসিমা মশারি গুঁজছে। এগারোটা বাজে। আফসারের ফোন বাজে।
সে দেখে, রেজাউলের নাম।
আফসার বারান্দায় বেরিয়ে যায়। বারান্দার শেষ মাথায় রেজার দরজা বন্ধ। ভেতরে অন্ধকার।
আফসার ফোন ধরে বলে, হ্যালো।
ওপাশে খুকখুক শব্দ হয়। দুইবার। তারপর বলে, আফসার ভাই, ঘুমায়া পড়ছিলেন?
না।
তুলির রেজাল্ট কী অইল?
আফসার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে। টিনের কার্নিশ বেয়ে পানি পড়ছে। সে বলে, ভালো।
কোন সাবজেক্টে কম আইছিল না?
অংকে।
অংক নিয়া চিন্তা কইরেন না। মাইয়া মানুষ অংকে দেরিতে ধরে। আমার আফায়ও এই রকম আছিল।
তারপর লাইন কেটে যায়।
আফসার দাঁড়িয়ে থাকে। বারান্দার নিচে নালায় পানি নামার শব্দ হয়। তুলির রেজাল্টের কথা সে কাউকে বলে নাই। দুই মাস আগে একদিন সন্ধ্যায়, বারান্দায়, সে রেজাকে বলেছিল মেয়েটা অংকে দুর্বল, একটা টিচার দরকার, খরচ আছে। রেজা তখন গলা পরিষ্কার করে বলেছিল, দেখতেছি।
আফসার ঘরে ঢুকে মশারির ভেতর ঢোকে। নাসিমা জিজ্ঞেস করে, কে ফোন দিছে?
আফসার বলে, দোকানের।
এই মিথ্যা কেন বলল, সে নিজেও জানে না। পরে অনেকবার এই কথা তার মনে পড়েছে। মানুষ প্রথম মিথ্যা বলে ফেলার পর দ্বিতীয়টা আর মিথ্যা মনে হয় না, তৃতীয়টা মনে হয় ঘরের কাজ।
আষাঢ়ের মাঝামাঝি টাকা আসতে শুরু করে।
প্রথমে সোবহানের বাকি। তিন হাজার দুইশো চল্লিশ টাকা, বিকাশে, রাত এগারোটার পর। সোবহান খাতা খুলে লাল কালি দিয়ে দাগ টেনে দেয়। খাতাটা সে সবাইকে দেখায়। তারপর আবু তাহেরের চার মাসের ভাড়া। আবু তাহের টাকা পেয়ে নিচে এসে রেজার দরজায় ধাক্কা দেয়, দরজা খোলে না, সে বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে বলে যায়, ভাই, আপনে মানুষ ভালা, খালি কথা কন না।
আফসারের চার হাজার আসে আষাঢ়ের একুশ তারিখ, দুপুর একটা সাতাশ মিনিটে। সে তখন দোকানে, কাটার মেশিনে হাত। এসএমএস আসার পর সে অনেকক্ষণ মোবাইল হাতে বসে থাকে। তারপর সে টাকা তোলে না। তিন দিন রেখে দেয়।
চার দিনের দিন সে টাকা তোলে। তুলির জন্য একজোড়া জুতা কেনে, স্কুলের কালো জুতা, পুরানোটার তলা খুলে গেছিল। বাকি টাকা নাসিমার হাতে দেয়। নাসিমা জিজ্ঞেস করে, এত টাকা কই পাইলা?
আফসার বলে, রেজাউল ভাই দিছে। পুরান ধার।
মিথ্যা ছিল না। এর চেয়ে সত্য সে বলতে পারত না। কিন্তু বলার পর তার মনে হয়, ঘরের ভেতর কেউ একজন দাঁড়িয়ে শুনল।
রাতে সে রেজার দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। দরজা খোলা। রেজা মেঝেতে। ঘরে হারিকেন জ্বলছে, বিদ্যুৎ নাই।
আফসার বলে, টাকা পাইছি।
রেজা তাকায়।
আফসার বলে, আপনে দেন নাই, জানি। কিন্তু টাকা তো টাকা।
রেজা বলে, হ।
আফসার বলে, আপনে কিছু করেন না ক্যান?
রেজা তখন যা বলে, আফসার তার অর্ধেক শুনতে পায়, কারণ পাশের ঘরে মেয়েরা টিভি ছেড়েছে। রেজা বলে, আমি কী করমু, আফসার ভাই। আমি তো আছিই।
রাতের একটু পরেই কারেন্ট চলে যায়। আফসার নিচে নামে।
দুই দিন পর নাসিমা ভাত-তরকারি বেড়ে একটা প্লেট ঢেকে তুলির হাতে দেয়। বলে, পাশের ঘরে দিয়া আয়।
তুলি যায়। অল্প পরেই ফিরে আসে, প্লেট হাতে।
নাসিমা বলে, দিলি না?
দিছি। চাচা নিল না।
কী কইল?
কিছু কয় নাই। তাকায়া আছিল। পরে হাত দিয়া দেখাইল।
নাসিমা প্লেট টেবিলে রাখে। তারপর আফসারের দিকে ফেরে।
মানুষটার কী অইছে?
জানি না।
তুমি পাশের ঘরে থাকো, তুমি জানো না?
আফসার বলে, আমি ডাক্তার না।
নাসিমা বলে, ডাক্তার লাগে না। চোখের সামনে শুকায়া যাইতাছে। আর তুমি হের টাকা দিয়া মাইয়ার জুতা কিনছ।
কথাটা বলে সে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। হাঁড়ি নাড়ার শব্দ হয়।
আফসার সেই রাতে ভাত খায় না। জুতাজোড়া তুলির খাটের নিচে ছিল। সে ঘুমানোর আগে একবার নিচু হয়ে দেখে, জুতা ঠিক জায়গাতেই আছে।
ওই সপ্তাহেই ফরিদ একটা ছবি দেখায়।
সোবহানের দোকানে, বেঞ্চে বসে। সে মোবাইল ঘুরিয়ে আফসারের দিকে ধরে। ছবিতে রেজা দাঁড়িয়ে আছে একটা সবুজ রঙের গেটের সামনে। পেছনে চওড়া রাস্তা, রাস্তার ওপাশে টিলার মতো উঁচু জায়গা, গাছপালা। রোদ পড়েছে। রেজার গায়ে নীল শার্ট।
ফরিদ বলে, ভাই কই গেছিল?
আফসার বলে, জানি না।
সোবহান ঝুঁকে দেখে বলে, এইটা সিলেটের দিকে মনে অয়।
বেঞ্চের আরেকজন বলে, চিটাগাং।
তারা কিছুক্ষণ জায়গা নিয়ে কথা বলে। তারপর ভাড়ার কথা ওঠে, তারপর বাজারের কথা। বেঞ্চে বসা সবাই জানে, রেজা মাসখানেকের ভেতর গলি থেকে বের হয় নাই। কেউ এই কথা তোলে না। কথা তোলার মতো কোনো জায়গাও কথার ভেতর তৈরি হয় না।
আফসার বাসায় ফিরে বারান্দায় উঠে দাঁড়ায়। সন্ধ্যার আগে বৃষ্টি হয়েছিল। দড়িতে নীল শার্ট ভিজে ভারী হয়ে ঝুলে আছে, হাতা রেলিং ছুঁয়ে আছে। সে হাতা তুলে রেলিংয়ের ওপর রাখে। তারপর ঘরে ঢোকে।
শ্রাবণে রেজা একদিন সোবহানের দোকানে আসে।
তিন মাস পর সে গলিতে বের হয়। গায়ে সেই নীল শার্ট, দড়ি থেকে নামানো, ছাতাপড়া দাগ কাঁধে। সে বেঞ্চের এক কোণায় বসে। সোবহান তাকে চা দেয়, পয়সা নেয় না।
কেউ প্রথমে কথা বলে না। তারপর ফরিদ বলে, ভাই, শইল ভালা?
রেজা গলা পরিষ্কার করতে যায়। শব্দ হয় না। সে আবার চেষ্টা করে। এইবার ভাঙা শব্দ বের হয়, খ্যাসখ্যাসে। সে বলে, ভালো।
বেঞ্চের লোকেরা তাকায়।
সোবহান বলে, ভাই, আপনের গলা এই রকম ক্যান?
রেজা বলে, ঠান্ডা।
ফরিদ বলে, ফোনে তো ঠিকই আছে।
কথাটা ফরিদ খারাপ মনে বলে না। সে হাসতে হাসতে বলে। কিন্তু কথাটা বেঞ্চের ওপর পড়ে থাকে, কেউ তোলে না।
রেজা চা শেষ করে ওঠার সময় ফরিদ বলে, ভাই, ওই কথার লাইগা আপনেরে ধন্যবাদ।
রেজা দাঁড়ায়। বলে, কোন কথা?
ফরিদের মুখ বদলায়। সে বলে, আপনে যেইটা কইলেন। আমার বইনের বিয়াডা যে ভাঙছিল, ওইটার লাইগা।
রেজা বলে, আমি কী কইছি?
কী কইছেন মানে? ফরিদ উঠে দাঁড়ায়। আপনে কইলেন আপনে তখন হারুন সাবের দোকানে বইসা কথাডা ছড়াইছিলেন। আপনে কইলেন আপনের ভুল অইছে। এতদিন পরে কইলেন। আমি কানলাম। আমার বইন এহন খুলনায়, তিন পোলা, তারেও কইছি।
রেজা বলে, আমি ওই কথা কই নাই।
ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ভাই, একবার ভালা কথা কইছেন। এহন আবার অস্বীকার করেন ক্যান? মানুষরে এইভাবে টানাটানি করে কেউ?
রেজা বলে, আমি কই নাই মানে আমি ওই কথা ছড়াই নাই। আমি ছড়াই নাই।
ফরিদ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বেঞ্চের লোকেরা কেউ কিছু বলে না। সোবহান কেটলিতে পানি ঢালে, শব্দ হয়।
ফরিদ বলে, তাইলে আপনে মাফ চাইলেন ক্যান?
রেজা বেরিয়ে যায়। গলি দিয়ে হাঁটে। তার হাঁটা দেখে আফসার, যে তখন গলির মাথায় রিকশা থেকে নামছে, বুঝতে পারে না রেগে আছে না ক্লান্ত।
শ্রাবণের শেষ দিকে আফসার দোকানের কাজে মিরপুর যায়। আঠা আর বোর্ড কিনতে। এক নম্বরে নেমে সে দেখে, হারুন সাহেবের টাইলসের দোকান এখনো আছে। সাইনবোর্ড বদলেছে, ভেতরে হারুন সাহেব বসা।
আফসার ঢোকে। সালাম দেয়। পরিচয় দেয়, কাটাসুর, রেজাউল করিমের পাশের ঘর।
হারুন সাহেব উঠে দাঁড়ায়। বলে, আরে বসেন। রেজা কেমন আছে?
ভালো।
হারুন সাহেব দোকানের ছেলেটাকে চা আনতে পাঠায়। বলে, ঈদের আগে ফোন দিছিল। এক ঘণ্টার উপরে কথা কইছি। এত বছর পরে।
আফসার কাপ হাতে বসে থাকে।
হারুন সাহেব বলে, কোন সালে টেরাক উল্টাইছিল, আপনে তো জানেন না, আপনে তখন আছিলেন না। আশি বস্তা টাইলস, সব গুঁড়া। ব্যাংকের কিস্তি মাথার উপরে। ওই রাইতে আমি দোকান বন্ধ কইরা ভিতরে বইসা আছিলাম। রেজা থাইকা গেছিল, বাইর হয় নাই।
সে চায়ে চুমুক দেয়। বলে, ওইদিন ফোনে হেয় ওই রাইতের কথা তুলল। কইল, ভাই, ওই রাইতের কথা মনে আছে?
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে হারুন সাহেব হাসে। বলে, ওই রাইতে আমি কানছিলাম। দুনিয়ার আর কেউ জানে না।
আফসার কিছু বলে না। দোকানের বাইরে রাস্তায় বাসের হর্ন।
হারুন সাহেব বলে, ওরে কইয়েন দোকানে আইতে। ম্যানেজারি দিমু। এই লাইনে বিশ্বাসী মানুষ পাওয়া যায় না।
আফসার বলে, আইচ্ছা।
ফেরার পথে বাসে জ্যাম লাগে। শ্যামলীর কাছে গাড়ি আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। আফসার জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবে, কথাটা রেজাকে বলবে। বাসায় ফিরে সে বারান্দায় দাঁড়ায়। রেজার দরজা খোলা, ভেতরে অন্ধকার, রেজা মেঝেতে বসা।
আফসার বলে, হারুন সাব সালাম দিছে।
রেজা মুখ তোলে। তাকিয়ে থাকে।
আফসার আর কিছু বলে না। সে ভাবে কালকে বলবে। কালকে সে বলে না। তার পরের দিনও না।
এর পরের দিনগুলোতে রেজা কথা বলা কমিয়ে দেয়। প্রথমে সে ছোট করে উত্তর দেয়। তারপর মাথা নাড়ে। তারপর সে কাগজে লিখতে শুরু করে।
পুরানো ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে সে পেছনে লেখে। আফসার সেই কাগজ নিয়ে নিচে যায়। বাড়িওয়ালাকে দিয়ে আসে, পানির লাইনের কথা বলে আসে, মুদি দোকানে চাল-ডালের কথা বলে আসে। কাগজে লেখা বড় বড় অক্ষর, বানান ভুল, শেষে সব সময় একটা লাইন থাকে, ভালা থাইকেন।
একদিন কাগজে লেখা থাকে, আফসার ভাই, আপনে কি আমার লগে কথা কন?
আফসার কাগজ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বলে, কী কইতে চান, কন।
রেজা মাথা নিচু করে বসে থাকে। ঠোঁট নড়ে। শব্দ হয় না।
শ্রাবণের শেষে কাগজ লেখাও বন্ধ হয়ে যায়।
মহল্লায় তখন রেজাউল করিমকে নিয়ে কেউ খারাপ কিছু বলে না। বরং উল্টা। ভাদ্র মাসে সোবহানের ছেলের অপারেশনের সময় হাসপাতালে টাকা যায়। মরিয়মের মায়ের চোখের ছানি কাটানোর টাকা যায়। গলির মাথায় মসজিদের জানালার গ্রিলের জন্য টাকা যায়, কমিটি রসিদ বইতে নাম লেখে, রেজাউল করিম, বাড়ি নং ৩৪/বি।
ভাদ্রের শেষে মরিয়মের বিয়ের প্রস্তাব আসে। ছেলে সাভারে ইলেকট্রিকের কাজ করে, বয়স বেশি, আগে একটা বিয়ে ছিল। মরিয়মের বাবা নাই, মা গ্রামে, চোখে দেখে না। মরিয়ম কার সঙ্গে পরামর্শ করবে, ঠিক করতে পারে না।
সে রাতে লিখে পাঠায়।
পরদিন সকালে ছাদে কাপড় শুকাতে দিয়ে সে অন্য মেয়েদের ডেকে পড়ে শোনায়। লম্বা উত্তর। তাতে লেখা আছে, আগে বিয়া থাকলে দোষ নাই, কেন ভাঙছিল সেইটা জানা দরকার। লেখা আছে, ছেলের দোকান নিজের না ভাড়ার, খোঁজ নিয়েন। লেখা আছে, মা চোখে দেখে না, বিয়ার পর মায়েরে কার কাছে রাখবেন সেই কথা আগে বইলা লইয়েন, পরে বললে মানুষ কথা রাখে না।
ছাদের মেয়েরা কথাগুলো শোনে। একজন বলে, ঠিকই তো কইছে।
মরিয়ম কাগজ ভাঁজ করে ব্লাউজের ভেতর রাখে। তিন মাস পর, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, সে সেই কাগজ শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যায়।
সেই দিন দুপুরে সে নিচতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠে বারান্দা পার হয়ে যাওয়ার সময় রেজার খোলা দরজার সামনে দিয়ে যায়। রেজা মেঝেতে বসা। মরিয়ম সালাম দেয়। রেজা মাথা নাড়ে। মরিয়ম তার ঘরে চলে যায়। বিয়ের কথা সে রেজাকে বলে না, কারণ সে ধরে নেয় রেজা জানে।
মানুষ তখন বারান্দায় উঠে এসে দরজায় ধাক্কা দেয় না। তারা নিচ থেকে হাত তুলে সালাম দিয়ে যায়। রেজা যদি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, তারা সালাম দেয়। রেজা যদি না থাকে, তারা বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে সালাম দেয়। দুইটাতে কোনো পার্থক্য থাকে না।
আশ্বিনের গোড়ায় ভোলা থেকে রাহেলা আসে। সঙ্গে সাত বছরের ছেলে, ঠান্ডায় নাক টানছে। ভাইয়ের ঘরে ঢুকে ব্যাগ নামায়। তারপর দুপুর পর্যন্ত সে ঘরে থাকে।
আফসার সেদিন দোকানে যায় নাই। সে বারান্দার এই মাথায় বসে সিগারেট খায়। ভেতর থেকে কোনো কথার শব্দ আসে না। একবার শুধু বাচ্চার গলা, মা, ভাত।
দুপুরে রাহেলা বেরিয়ে আসে। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে সে আফসারকে ডাকে।
ভাই, আপনে তো পাশেই থাকেন।
জি।
আমার ভাইয়ের কি কোনো অসুখ অইছে?
আফসার বলে, ডাক্তার দেখাইছিলাম। কয় কিছু নাই।
রাহেলা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে, ফোনে তো ভালাই কথা কয়। রোজ রাইতে ফোন দেয়। পোলার ঠান্ডার খোঁজ নেয়। কাইল রাইতেও দিছে। কইছে আইজকা আইতে, বাসে ভিড় অইলে জানালার পাশে বইতে।
আফসার বলে না কিছু।
রাহেলা বলে, ঘরে বইসা আছে, আমার দিকে তাকায়া আছে, কথা কয় না। আমি কী করমু ভাই। আমার তো মনে অইতাছে আমি ভুল বাসায় আইছি।
আফসার তখন বলে, যেটা পরে তাকে অনেকদিন বিরক্ত করে। সে বলে, আপা, উনি ভালো আছেন। আপনে চিন্তা কইরেন না।
রাহেলা মাথা নাড়ে। বলে, হ, আমিও এইটাই ভাবি।
বিকালের বাসে রাহেলা চলে যায়। যাওয়ার সময় সে ভাইয়ের পায়ে হাত দেয়। রেজা হাত তোলে, মাথায় রাখে। ঠোঁট নড়ে। কোনো শব্দ হয় না।
পরদিন রাতে রাহেলা ফোন করে। ভাইয়ের নম্বরে।
ওপাশ থেকে প্রশ্ন আসে, পৌঁছাইছ?
আশ্বিন-কার্তিক পার হয়ে যায়।
নীল শার্ট তখনো দড়িতে। রোদে-বৃষ্টিতে রং উঠে সাদাটে হয়ে গেছে, কাঁধের ছাতা ছড়িয়েছে। মরিয়ম দুইবার শার্ট নামিয়ে রেজার দরজার কাছে রেখে গেছে। দুইবারই পরদিন সকালে শার্ট আবার দড়িতে উঠে গেছে। এই নিয়ে কেউ কথা বলে না।
গুড়ের হাঁড়ি খালি হয়ে যায়। পিঁপড়ার লাইন তারপরও কিছুদিন থাকে, দেয়াল বেয়ে ওঠে, হাঁড়ির মুখে গিয়ে ঘোরে, নেমে আসে।
কার্তিকের শেষে ঠান্ডা পড়ে। গলির নালা শুকিয়ে আসে, তলায় কালো ময়লা জমে থাকে, সকালে গন্ধ ওঠে। বাড়িওয়ালা আবু তাহের নিচতলার দেয়ালে চুন করায়। দোতলার দেয়ালে করায় না, বলে টাকা নাই। টিনের ফাঁক দিয়ে ভোরের দিকে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে।
আফসারের ফোন তখন সপ্তাহে দুই-তিন রাত বেজে ওঠে।
সে আর বারান্দায় বের হয় না। মশারির ভেতর বসেই ধরে, গলা নামিয়ে কথা বলে। প্রথম দিকে সে শুধু উত্তর দিত। এখন সে বলে।
সে বলে, দোকানের মালিক বেতন থেকে দুইশো টাকা কাটে, কারণ এক বান্ডিল কাগজ নষ্ট হয়েছিল, নষ্ট সে করে নাই। সে বলে, তুলির স্কুলের বেতন তিন মাস বাকি, স্কুল থেকে চিঠি দিছে। সে বলে, তার কোমরের ব্যথা বাড়ছে, বসে কাজ করলে ডান পা ঝিমঝিম করে। সে বলে, গ্রামে তার ভাই বসতভিটার সীমানার খুঁটি সরিয়ে দিয়েছে, ফোন দিলে ভাই ধরে না।
ফোনের ওপাশ থেকে মাঝেমধ্যে অল্প কথা বলে। কাগজের কথা শুনে বলে, মালিকের সামনে তর্ক কইরেন না, পরে সুযোগ বুইঝা কইয়েন। খুঁটির কথা শুনে বলে, নিজে গিয়া দেখেন। ফোনে জমির কথা হয় না।
একদিন কথা বলতে বলতে আফসার খেয়াল করে, চোদ্দো বছরে সে রেজাকে নিজের কোনো কথা বলে নাই। রেজা পাশের ঘরে ছিল, বারান্দায় ছিল, দড়িতে কাপড় দিতে গেলে হাত সরিয়ে জায়গা করে দিত। ওইটুকুই।
আফসার তখন ফোন কানে রেখে দেয়ালের দিকে তাকায়। দেয়ালের ওপাশে রেজার ঘর। ওই ঘরে কোনো শব্দ হয় না।
অগ্রহায়ণের এক সন্ধ্যায় আফসার দোকান থেকে ফিরে দেখে, রেজা বারান্দায় বসে আছে। অনেক দিন পর।
আফসার তার পাশে বসে। গলিতে নিচে ভ্যান যাচ্ছে, ফরিদের ভ্যান, চাকার শব্দ। ওপাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে কেউ কাপড় তুলছে।
রেজা আফসারের দিকে ফেরে। ঠোঁট নড়ে।
আফসার কান এগিয়ে নেয়।
রেজা ফিসফিস করে বলে, একটা ফোন দেন।
কারে?
রেজা তার নিজের বুকে আঙুল দিয়ে দুইবার টোকা দেয়।
আফসার মোবাইল বের করে। রেজাউল করিমের নাম খুঁজে বের করতে তার সময় লাগে না, উপরের দিকেই থাকে, সাম্প্রতিক তালিকায়।
রিং হয়। একবার। দুইবার। পাঁচবার।
তারপর কেউ ধরে।
কোনো কথা হয় না। ওপাশে কোনো শব্দ নাই, গাড়ির শব্দ নাই, ফ্যানের শব্দ নাই। খালি চাপা নিঃশ্বাসের মতো কিছু, যেটা মোবাইলের নিজের শব্দও হতে পারে।
আফসার মোবাইল রেজার কানের কাছে ধরে।
রেজা চোখ বন্ধ করে। তার গলার কাছটা একবার ওঠে-নামে। সে গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। শব্দ হয় না।
লাইন কেটে যায়।
আফসার মোবাইল পকেটে রাখে। তার হাত একটু কাঁপে, সে সেটা লুকানোর জন্য পকেটে হাত রেখেই বসে থাকে। রেজা বারান্দার রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পর আফসার ওঠে। ঘরে চাল নাই, নাসিমা বলে দিয়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে শোনে, নিচতলার কোনো একটা ঘরে মোবাইল থেকে কেউ কথা বলছে। কী কথা, বোঝা যায় না। কিন্তু কথার শুরুতে খুকখুক করে দুইবার শব্দ হয়।
আফসার সিঁড়িতে এক মুহূর্ত দাঁড়ায়। তারপর সে নেমে যায়, দরজাগুলির দিকে তাকায় না। গলিতে বাতি জ্বলে উঠেছে। মুদি দোকানে ভিড়, লোকজন চাল-ডাল নিচ্ছে, দাম নিয়ে কথা বলছে। সে লাইনে দাঁড়ায়।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হয়, ফেরার পথে ওপরে উঠে সে শার্টটা নামিয়ে ভাঁজ করে রেখে আসবে। এটা সে গত ছয় মাসে অনেকবার ভেবেছে।
চাল নিয়ে ফেরার সময় সে বারান্দায় আলো দেখে না। রেজার দরজা ভেজানো। দড়িতে শার্টটা বাতাসে একটু নড়ে।
আফসার নিজের ঘরে ঢোকে। ভাত বসে। খাওয়ার পর মশারি টাঙানোর সময় তার ফোন বাজে।
সে বারান্দায় বের হয় না। মশারির ভেতর বসেই ধরে।
খুকখুক। দুইবার।
আফসার ভাই, খাইছেন?
আফসার বলে, হ।
তুলি পড়তাছে?
শুইয়া পড়ছে।
কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে, শার্টটা তুইলা রাইখেন। ছাতা ধইরা যাইতাছে।
আফসার বলে, আইচ্ছা।
লাইন কেটে যায়। নাসিমা মশারির ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করে, কে?
আফসার বলে, পাশের ঘরের।
#raisulsohanstories
আমি