মূল লেখায় যান
রাইসুল সোহান
সব লেখা

কেমন লাগে মেসির বিপক্ষে খেলতে?

মেসি

সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির বিপক্ষে খেলার অনুভূতি কেমন?

এমন একটা প্রশ্ন, যার উত্তর ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিদের পাশে বসে দিতে পারলে প্রায় যেকোনো ফুটবলারই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবেন।

মেসি বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নামবেন, যেখানে টুর্নামেন্টের ৫ ম্যাচে তিনি ইতিমধ্যেই ৮ গোল করে ফেলেছেন…

২০০৬ সাল। দিয়েগো ম্যারাডোনা হসপিটালিটি বক্সে হাত উঁচিয়ে আছেন, তার মুখে চওড়া হাসি। চারপাশে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদ্‌যাপন করতে উঠে দাঁড়িয়েছেন। ১৮ বছর বয়সে লিওনেল মেসি তার বিশ্বকাপ অভিষেক করতে চলেছেন।

শুনতে যতই অবাক লাগুক না কেন, লম্বা চুলের এই কিশোর সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর খেলোয়াড়দের কাছে রীতিমতো এক রহস্য ছিল।

সেদিনের ম্যাচে খেলা ইভান এরগিচ বলেন, “আমরা মেসিকে নিয়ে আলাদা করে খুব বেশি প্রস্তুতি নিইনি, কারণ সে আসলে কতটা ভয়ংকর, তা তখনও আমরা বুঝে উঠতে পারিনি।”

জার্মানিতে ম্যাক্সি রদ্রিগেজের বদলি হিসেবে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় তাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। মেসির প্রথম পাসটি ভুল জায়গায় গিয়েছিল। তবে চার মিনিট পরেই তিনি হার্নান ক্রেসপোকে দিয়ে একটি গোল করান। আর দশ মিনিট পর নিজেই গোল করেন।

এরগিচ, যিনি পরবর্তীতে বাসেলের হয়ে বার্সেলোনার বিপক্ষে আরও দুবার মেসির মুখোমুখি হয়েছিলেন, রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ ছিলেন। বর্তমানে লেখক এবং নাট্যকার হিসেবে পরিচিত এরগিচ, মেসিকে নিয়ে কথা বলেন এক বুক বিস্ময় আর শ্রদ্ধা নিয়ে।

“সে এমন এক খেলোয়াড়, যার ক্ষেত্রে আপনি আগে থেকে জানলেও যে সে কোন দিকে ড্রিবল করবে, তবুও তাকে আটকানোর কোনো সুযোগ আপনার নেই। আপনি যদি আধা সেকেন্ড আগেও একদিকে ঝুঁকে পড়েন, সে বলটা অন্য দিকে নিয়ে যাবে। আর যখন আপনার মনে হবে যে আপনি বলটা কেড়ে নিতে চলেছেন, ঠিক তখনই সে আলতো করে বলটা ছুঁয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবে, এমনকি প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও। বিশেষ করে এই জায়গাটায়, আমার তাকে জাদুকর মনে হয়।”

“আমি যখন খেলতাম, তখন ফুটবলের দর্শন নিয়ে একটি কলাম লিখতাম। আমার মনে আছে, আমি কোচদের, বিশেষ করে হোসে মরিনহোর হতাশা নিয়ে লিখেছিলাম, যিনি তাকে থামানোর কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে কখনো কখনো নোংরা কৌশল অবলম্বন করতেন।”

“মেসি ড্রিবলারদের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রেখেছেন— আধুনিক কোচেরা অনুশীলন এবং ম্যাচ, উভয় জায়গাতেই খেলাটাকে ‘টু-টাচ’ বা দুই ছোঁয়ায় সীমাবদ্ধ করে ড্রিবলারদের প্রায় ধ্বংসই করে ফেলেছেন।”

“ড্রিবলিং একটি মৃতপ্রায় শিল্প, এবং আমি মনে করি ফুটবল বিশ্বে এই স্কিলটাকে আবারও প্রাসঙ্গিক করে তোলাটাই মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন। ”

খালি চোখ এবং পরিসংখ্যান দুটোই বলছে, মেসির ড্রিবলিংয়ের সেরা সময় ছিল ওই শুরুর বছরগুলো যখন তিনি বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক ত্রয়ীর অংশ হিসেবে ডান দিক থেকে খেলতেন। বিস্ফোরক গতি, অবিশ্বাস্য ভারসাম্য এবং পায়ের দারুণ কাজ সব মিলিয়ে মেসি ছিলেন প্রায় অজেয়।

“এমনকি আমরা ক্যাম্প ন্যুতে যাওয়ার আগেই ফ্রান্স থেকে আমাকে ফোন করে জানতে চাওয়া হচ্ছিল মেসিকে আটকানোর কী প্ল্যান আমার,” ২০০৬ সালে চেলসি ও বার্সেলোনার মধ্যকার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে বলেন ফ্রান্সের সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার গালাস।

“আমার মনে আছে আমি তাদের বলেছিলাম: ‘আমি জানি না’।”

“ম্যাচের আগের দিন আমি মেসির ভিডিও ক্লিপ দেখছিলাম। সে তখনো একটা বাচ্চা, বয়স ১৮, কিন্তু তখনো সে একজন জিনিয়াস। সম্ভবত তার বিপক্ষে খেলার চেয়ে তাকে টিভিতে দেখাই ভালো ছিল, কারণ আপনি নিশ্চয়ই ইউটিউবের হাইলাইট রিলের অংশ হতে চাইবেন না।”

তবুও, মেসির শিকার হওয়াতে কোনো লজ্জা ছিল না। অনেকের কাছে এটা ছিল গর্বের বিষয়। দেপোর্তিভো লা করুনিয়া এবং রিয়াল বেটিসের সাবেক মিডফিল্ডার আন্দ্রেস গুয়ার্দাদো মাঠে মেসির সাথে তার ২০টি ছবি নিয়ে বেশ গর্ব করতেন। এই মেক্সিকান বলেছিলেন, “এর কোনোটাতেই আমার পায়ে বল নেই।”

এরগিচও নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে একই সুরে কথা বলেন। “আমার অনুভূতি ছিল মিশ্র। একজন খেলোয়াড় হিসেবে আপনি হতাশ এবং অপমানিত বোধ করতে পারেন, কিন্তু খুব কাছ থেকে আপনি একজন ফুটবল জিনিয়াসকে দেখছেন, যিনি সম্ভবত সর্বকালের সেরা।”

“তাকে থামানোর কোনো কৌশলই কাজে আসত না— না ট্যাকটিকাল, না টেকনিকাল, না ফিজিক্যাল, ওই যুগের সেরা ডিফেন্ডাররা এর সাক্ষী।”

বার্সেলোনায় নিজের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌসুমে, মেসি তার ড্রিবল করার প্রচেষ্টার ৭৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই সফল হয়েছিলেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা লিগে একজন ১৮ বছর বয়সীর জন্য এটি একটি অবিশ্বাস্য সাফল্যের হার।

শুরুর দিকে মেসি সাধারণত ডান প্রান্তে তার জাদু দেখাতেন। এরপর তিনি পজিশন পরিবর্তন করেন এবং আরও বেশি সেন্ট্রাল বা মাঝমাঠে এসে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা শুরু করেন।

২০০৭ সালে বার্সেলোনার ডান দিকের উইঙ্গার হিসেবে খেলার সময়, গেতাফের বিপক্ষে তিনি একটি আইকনিক গোল করেন। ডান দিকের টাচলাইনের কাছাকাছি বল পেয়ে মেসি প্রথমে একজনকে কাটিয়ে যান, এরপর আরেকজনকে নাটমেগ করেন। তারপর আরও দুজন প্রতিপক্ষকে এঁকেবেঁকে পাশ কাটিয়ে গোলরক্ষককে মাটিতে ফেলে ডান পায়ে বল জড়িয়ে দেন জালে।

পরের দিন স্প্যানিশ সংবাদপত্র Diario AS-এর শিরোনাম ছিল: “ম্যারাডোনার ছদ্মবেশে মেসি”।

ড্রিবলিংয়ের মতোই শট নেওয়ার ক্ষেত্রেও মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রতিপক্ষকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধোঁয়ায় রাখা। গোলরক্ষকরা বুঝতেই পারতেন না তিনি নিয়ার পোস্টে মারবেন, নাকি ফার পোস্টে। কারণ খুব একটা পা না ঘুরিয়েই (minimal backlift) তিনি প্রচণ্ড শক্তিতে বলে শট মারতে পারতেন।

এই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন অ্যাথলেটিক ক্লাবের সাবেক গোলরক্ষক গোরকা ইরাইজোজও। মেসির বিপক্ষে ২৭টি ম্যাচ খেলে তিনি প্রায় সব ধরনের গোলই হজম করেছেন।

ইরাইজোজ বলেন, “আপনার মনে হবে যে আপনি জায়গা কভার করেছেন, আপনি জানেন কী হতে চলেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই সে অন্য কিছু করে বসবে।”

“তার শারীরিক গঠন তাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বল লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে, পায়ের খুব বেশি সুইং ছাড়াই, সে কোথায় শট নিতে যাচ্ছে তার কোনো ইঙ্গিত না দিয়েই। এটি তাকে অপেক্ষা করতে সাহায্য করে; হয় শরীরের সূক্ষ্ম মোচড়ে ফার পোস্টে বল পাঠায়, নয়তো নিয়ার পোস্টে জোরালো শট নেয়।”

গালাস যখন দ্বিতীয়বারের মতো মেসির মুখোমুখি হন, ২০০৯ সালের শুরুতে একটি প্রীতি ম্যাচে, তখন তিনি আগের চেয়ে বয়সে বড় এবং অভিজ্ঞ। কিন্তু সমস্যা হলো, মেসি ততদিনে আরও বেশি ভয়ঙ্কর। তিনি তার প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতার পথে ছিলেন এবং ফুটবলটা খেলছিলেন, বা অন্তত দেখছিলেন ভবিষ্যতের দৃষ্টিতে।

“বল না থাকলে সে সবসময় হাঁটতে থাকে। কিন্তু যখন সে হাঁটে, তখন সে চারপাশের সব তথ্য মাথায় গেঁথে নেয়। এরপর যখন সে বল রিসিভ করে, তখন সে ঠিকই জানে তাকে কী করতে হবে এবং কোথায় যেতে হবে,” গালাস বলেন। “মনে হতো সে যেন ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’-এ আছে: সবার আগে সে সবকিছু দেখতে পেত।”

একজন ইনভার্টেড রাইট-উইঙ্গার থেকে আরও গভীরে নেমে ‘ফলস নাইন’ হিসেবে মেসির রূপান্তর প্রতিপক্ষের জন্য নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। কেন্দ্রীয় আক্রমণভাগে খেলায় তিনি মাঠজুড়ে অবাধে ঘোরাফেরা করার স্বাধীনতা পান। অনেক সময় তাকে শুধু হাঁটতে দেখা যেত। অথচ ফুটবল মাঠে মেসির সেই হাঁটার চেয়ে বিপজ্জনক দৃশ্য খুব কমই আছে।

মাঠে তার এই জরিপ চালানোর মিশনগুলো কিংবদন্তিতুল্য। চোখ দিয়ে ঘন ঘন এদিক-ওদিক তাকিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা (অধ্যাপক গেইর জর্ডেট মাঠে তথ্য সংগ্রহের এই পদ্ধতিকে বোঝাতে ‘মাইক্রো-স্ক্যানিং’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন), মেসি যেন মুহূর্তের মধ্যে ছবি তুলে নেন, যা পরের মুহূর্তগুলোতে তার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

ভ্যালেন্সিয়া, লিডস ইউনাইটেড এবং স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার পাবলো হার্নান্দেজ বলেন, “সে অদ্বিতীয়। আমি তার মতো কোনো খেলোয়াড় দেখিনি। সে অন্য সবার চেয়ে দুই সেকেন্ড আগে চিন্তা করে।”

অ্যাকাডেমিকরাও দীর্ঘদিন ধরে মেসির আচরণ, বিশেষ করে তার কগনিটিভ বা জ্ঞানীয় দক্ষতা নিয়ে মুগ্ধ। ফলিত গণিতের অধ্যাপক এবং ‘Twelve Football’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড সাম্পটার বার্সেলোনায় মেসির সময়ে ক্লাবের সাথে কাজ করেছিলেন। তিনি খেলার ধরন, খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত এবং সময় ও স্থানের সাথে তাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।

“এবং আমরা যা পেয়েছিলাম,” অধ্যাপক সাম্পটার দ্য অ্যাথলেটিক-এর অলিভার কে-কে দ্য সকার ১০০ (The Soccer 100)-এ বলেন, “তা হলো, মেসি এবং তার সতীর্থরা এমন কিছু ফাঁকা জায়গা (পকেটস অফ স্পেস) খুঁজে বের করত যার অস্তিত্ব তখনো তৈরি হয়নি। সেই জায়গাটা হয়তো পরবর্তী দুই বা তিন সেকেন্ডের জন্য তৈরি হতো না। সেই দিক থেকে, হ্যাঁ, এই খেলোয়াড়রা দুই বা পাঁচ সেকেন্ড দূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পারত। মেসির ক্ষেত্রে মনে হতো সে যেন ১০ মিনিট পরের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে।”
“আমি আক্ষরিক অর্থে বলছি না, ফুটবল খুব পরিবর্তনশীল একটি খেলা। তবে ম্যাচের শুরুতেই সে ম্যাপ করে নিত কোথায় কোথায় ফাঁকা জায়গা তৈরি হতে পারে, তারপর ম্যাচ যত গড়াত সে নিশ্চিত করত যেন সে ওই জায়গাগুলোতেই থাকে।”

তবে মেসির এই হাঁটা এবং পর্যবেক্ষণের আরেকটি সুবিধাও ছিল। তিনি প্রতিপক্ষের মন নিয়ে খেলতেন। ডিফেন্ডারদের জন্য যেগুলো নিষিদ্ধ জোন, সেখানে অবস্থান নিয়ে তিনি তাদের রীতিমতো যন্ত্রণা দিতেন।

“কাকে কী করতে হবে তা জানার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রচুর কথা বলতে হয়,” রাফায়েল ভারান ব্যাখ্যা করেন, যিনি রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং ফ্রান্সের ডিফেন্ডার হিসেবে ২১ বার মেসির মুখোমুখি হয়েছেন। “মেসির স্পেশালিটি হলো এমন জায়গায় হাঁটা যেখানে আপনি বুঝতে পারবেন না তাকে কে ডিফেন্ড করবে। এটা কি মিডফিল্ডার? নাকি ফুল-ব্যাক? নাকি সেন্টার-ব্যাক?”

“আপনার মনে হবে সে হাঁটছে, দৌড়াচ্ছে না, তাই আপনি ডিফেন্ডিংয়ে ঢিলেমি দেবেন। কিন্তু ঘটনা পুরোপুরি উল্টো। সে নিজেকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যায় যেখান থেকে সে ভালোভাবে আক্রমণ করতে পারে। সে সবসময় একটি অন্তর্বর্তীকালীন জোনে থাকে। এটা খুবই কঠিন, কারণ সাধারণত যখন আমরা আক্রমণ করি, তখন ডিফেন্ডাররা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সতর্কতার মাত্রা কমে যায়। কিন্তু তার বিপক্ষে, যখন আপনি আক্রমণ করছেন, তখনই সতর্কতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকতে হয়। ওই সময়ে আপনি যদি এক মিটারও পেছনে থাকেন, তবে সব শেষ।”

গালাস মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। “এমনকি সে হাঁটলেও, একজন ডিফেন্ডার হিসেবে আপনি চাইবেন না সে বল পাক, তাই আপনি তার কাছাকাছি যাওয়ার কথা ভাববেন। কিন্তু আপনি যদি তার কাছাকাছি যান, সে ইতিমধ্যেই ওই লড়াইটা জিতে গেছে। কারণ সে যদি বল নাও পায়, আপনি আপনার পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দিয়েছেন এবং সে ঠিক এটাই চায়।”

বার্সেলোনায় গার্দিওলাও ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। ২০০৯ সালের মে মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে, গার্দিওলা মেসিকে ফলস নাইন হিসেবে ব্যবহার করার একটি সুযোগ দেখেন। বার্সেলোনা ম্যানেজার এর আগে সংক্ষেপে এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন, কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন: প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদ, খেলা সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে, আর লিগ শিরোপা তখন ঝুঁকির মুখে।

পরিকল্পনাটি এমন ছিল যে, দুটো বিষয়ের যেকোনো একটি ঘটবে। হয় রিয়াল মাদ্রিদের কোনো একজন সেন্টার-ব্যাক মেসিকে অনুসরণ করে নিচে নেমে আসবে, যার ফলে বার্সেলোনার ওয়াইড অ্যাটাকার স্যামুয়েল ইতো এবং থিয়েরি হেনরির ভেতরে ঢুকে আক্রমণ করার জায়গা তৈরি হবে। অথবা রিয়াল মাদ্রিদের সেন্টার-ব্যাকরা নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে এবং মেসি বার্সেলোনার মিডফিল্ডের সাথে যুক্ত হয়ে ফোর-ভার্সাস-থ্রি (চার জনের বিপক্ষে তিন জন) ওভারলোড তৈরি করবেন।

এটি ছিল একটি ট্যাকটিকাল মাস্টারস্ট্রোক; বার্সেলোনা মাদ্রিদকে ৬-২ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল।

কয়েক সপ্তাহ পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বার্সেলোনার মুখোমুখি হয়, তখন তারা দুটি পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা করেছিল: মেসি ডান উইংয়ে খেলবে, এবং মেসি ফলস নাইন হিসেবে খেলবে। তবে সে যেখানেই খেলুক না কেন, মূল রক্ষণাত্মক উদ্দেশ্য ছিল তার কাছে বল যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করা।

সেই ফাইনালে বার্সেলোনার দ্বিতীয় গোলটি করার জন্য দুই ইউনাইটেড খেলোয়াড়ের মাঝে মেসির ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়াটা মোটেও বিস্ময়কর ছিলত্তি না। তবে গোলটা কীভাবে তৈরি হয়েছিল। জাভির দেওয়া একটি ডিপ ক্রস বা কীভাবে ফিনিশ হয়েছিল, তা নিয়ে একই কথা বলা যায় না।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের তৎকালীন সহকারী ম্যানেজার রেনে মিউলেনস্টিন বলেন, “হতাশাজনক ব্যাপার ছিল যে মেসি হেডে গোল করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম এডুইন ফন ডার সার, রিও ফার্ডিনান্ড এবং নেমানজা ভিদিচের মতো আমাদের যে শক্তি ও উচ্চতা ছিল, তাতে আমাদের বিপক্ষে সে আর যাই হোক, অন্তত হেডে গোল করতে পারবে না।”

“ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকাটা আসলে বেশ বিরল একটি বৈশিষ্ট্য, যেখানে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডাররাও আপনাকে ছুঁতে পারে না, এবং তার সম্পর্কে আমার এটাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে,” যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডিফেন্ডার জে ডিমেরিট কয়েক বছর আগে দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুবার মেসির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করছিলেন তিনি। ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকা এবং চার বছর পর নিউ জার্সিতে একটি প্রীতি ম্যাচে।

“আমরা সবাই তার কাছে পৌঁছানোর, জায়গা বন্ধ করার, আমাদের চারপাশের সতীর্থদের ব্যবহার করার এবং একে অপরকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু দিন শেষে, মনে হয় সে ঠিকই সেই ফাঁকা জায়গাটা খুঁজে নেয়, সেই এক ধাপ এগিয়ে থাকে।”

“সে আপনাকে বিভ্রান্ত করে দেয়। সে আপনাকে এমন এক জায়গায় ফেলে দেয় যেখানে আপনি ভাববেন, ‘সে কোথায় গেল? আর আমিই বা এখানে কীভাবে এলাম? সে কোথা থেকে এল?’, বল ছাড়া নড়াচড়া করার তার এই অদ্ভুত ক্ষমতার কারণে।”
ডিমেরিট আরও একটি কথা বলেছিলেন। এমন একটি কথা যা প্রায় প্রতিটি প্রতিপক্ষই অনুভব করে যখন তারা উল্টো দিকে তাকিয়ে মেসিকে দেখে।

“আপনি গ্রেটনেসের (সেরা কিছুর) উপস্থিতিতে আছেন। তাই এটি আমাদের সবার খেলাকেই উন্নত করে তোলে। আপনি ওয়েন গ্রেটজকি এবং লেব্রন জেমসের সাথে একই মাঠে আছেন।”

আর্সেনাল, চেলসি এবং ইংল্যান্ডের অসামান্য লেফট-ব্যাক অ্যাশলি কোল বলেন,
“ব্যক্তিগতভাবে তাকে মার্ক করা অসম্ভব ছিল, তবে একটি দল হিসেবে আপনাকে তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করতে হতো, বক্সের আশেপাশে তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করতে হতো। চেলসিতে আমরা সেটা করেছিলাম। ২০১২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে সে একটি পেনাল্টি মিস করেছিল, আর মিউনিখে শিরোপা জেতার পথে সেটাই ছিল আমাদের জন্য পাওয়া ভাগ্যের ছোঁয়া।”

সেই সময়ে মেসির জন্য এটি ছিল একটি বিরল ব্যর্থতা। ২০১২ সালে, তিনি টানা চতুর্থবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেন। এমনকি তার নিজের মানদণ্ডেও তার পরিসংখ্যানগুলো ছিল অবিশ্বাস্য। এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে (পঞ্জিকাবর্ষে) গার্ড মুলারের ৮৫ গোলের রেকর্ড ভেঙে দেন মেসি। পাশাপাশি এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোল করার আর্চি স্টার্কের ৮৭ বছরের পুরোনো বিশ্বরেকর্ডও ভেঙে দেন তিনি।

পরের মৌসুমে, মেসি ২৯টি পূর্ণাঙ্গ ম্যাচের সমপরিমাণ সময়ে ৪২টি নন-পেনাল্টি গোল করেন। এর মধ্যে তিনটি গোল তিনি করেছিলেন অ্যাথলেটিক ক্লাবের সাবেক গোলরক্ষক ইরাইজোজের বিপক্ষে। এর মধ্যে সান মামেসে ২-২ ড্র হওয়া ম্যাচে করা সেই একক গোলটিও ছিল, যা ১৩ বছর পরও আপনার নিশ্বাস আটকে দেবে।

গোলপোস্ট থেকে ৩০ গজ দূরে বল পেয়ে মেসি তার সেই বিভ্রান্তিকর দৌড় শুরু করেন, একবার এদিকে তো আরেকবার ওদিকে কেটে, একদল খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান। সেই অংশটুকু যতটা জাদুকরী এবং উপভোগ্য, ড্রিবলিংয়ের শেষে বল সরিয়ে তার শট নেওয়ার ধরনটাও ঠিক ততটাই অসাধারণ।

“ওই মুভমেন্টটা আপনাকে একটু আগে আমি যা বলছিলাম তা ব্যাখ্যা করে: আপনি জানেন যে সে ওই দিকে শট নিতে যাচ্ছে, কিন্তু সে আপনার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকে, কারণ সে জানে তাকে কোন গতি ব্যবহার করতে হবে, কেমন টাচ দিতে হবে এবং গোলরক্ষক হিসেবে আমি কোথায় পৌঁছাতে পারব না,” ইরাইজোজ ব্যাখ্যা করেন।
আর এর আগে তার সেই অবিশ্বাস্য ড্রিবল?

“অনেক সময় এর সাথে তার শারীরিক গঠনের সম্পর্ক থাকে। তার শরীরের নিচের অংশটা খুব শক্তিশালী ছিল,” ইরাইজোজ বলেন। “(থিয়েরি) হেনরি খুব সুন্দর করে এটা ব্যাখ্যা করেছিলেন: কীভাবে সে শুধুমাত্র পায়ের গোড়ালির একটি সাধারণ ছোঁয়ায় দিক পরিবর্তন করতে পারত এবং তা-ও তীব্র গতিতে। তবে এটা শুধু ওই একটা খেলার বিষয় নয়। কোপা দেল রে ফাইনালে মিকেল রিকো সাইডলাইনের কাছে তাকে লাথি মেরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে পড়েনি। সে খুব শক্তিশালী ছিল।”

সেই ফাইনালে, অ্যাথলেটিক কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দে সিদ্ধান্ত নেন যে লেফট-ব্যাক মিকেল বালেনজিয়াগা মেসিকে ম্যান-টু-ম্যান মার্ক করবেন। একটি কৌশল যা অতীতে কখনো কখনো (এবং খুবই কদাচিৎ) দলগুলোর জন্য কাজে এসেছে।

কলম্বিয়ার মিডফিল্ডার কার্লোস সানচেজ ২০১১ সালের কোপা আমেরিকার গোলশূন্য ড্র হওয়া একটি ম্যাচে ছায়ার মতো মেসির সাথে লেগে ছিলেন এবং সফলভাবে তাকে বন্দি করে রেখেছিলেন। সানচেজ সেই চ্যালেঞ্জ এবং ভূমিকার সাথে আসা দায়িত্ব উপভোগ করেছিলেন ঠিকই, তবে এটাকে বেশ ক্লান্তিকর এবং ছুটির দিনে সুইমিংপুলের পাশে একটি ছোট বাচ্চাকে চোখে চোখে রাখার মতো কঠিন কাজ বলেও মনে হয়।

“তার দিকে প্রতিমুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ দিতে হয়,” সানচেজ বলেন।

“আধা সেকেন্ডের মধ্যে সে এমন কিছু করে বসতে পারে যে, আমি এতক্ষণ যা যা করেছি তার সব অর্থহীন হয়ে যাবে।”

অ্যাথলেটিক এবং বালেনজিয়াগার ক্ষেত্রে, ভালভার্দের পরিকল্পনা ২০ মিনিট পরেই মুখ থুবড়ে পড়ে। মেসি বালেনজিয়াগাকে দুবার কাটান, পাশাপাশি অ্যাথলেটিকের আরও তিন খেলোয়াড়কে পরাস্ত করেন। সেটি ছিল এমন এক ড্রিবল যা স্কুলের মাঠে মানায়, কোনো কাপ ফাইনালে নয়।

কয়েক বছর আগে জাবিয়ের এতেক্সেইতা দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেছিলেন, “আমাদের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা লিওকে থামানোর চেষ্টা করেছিল, এমনকি ফাউল করারও চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাকে মাটিতে ফেলা অসম্ভব ছিল।”

“আমি ব্লক করার জন্য এগিয়ে এসেছিলাম, ভেবেছিলাম সে ফার পোস্টে শট নেবে। এবং আমি ভালোভাবেই ব্লক করেছিলাম; ওই শটের দিকটা আমার কভার করা ছিল। কিন্তু তার ক্ষমতা ছিল একেবারে শেষ সেকেন্ডে এসে সিদ্ধান্ত বদলে নিয়ার পোস্টে শট নেওয়ার এবং প্রচণ্ড জোরে বলটা হিট করার। ওটা একটা গোলাজো (দুর্দান্ত গোল) ছিল। গোলটা আমাদের এমন এক অনুভূতির সামনে দাঁড় করিয়েছিল যে, তাকে থামানোর জন্য একটি ফুটবল দল যা যা করতে পারে আমরা তার সবই করেছিলাম, কিন্তু তারপরও আমরা ব্যর্থ হয়েছিলাম।”

মেসি ঠিক তিন সপ্তাহ আগে ক্যাম্প ন্যুতেও এরকমই এক ক্লাসিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন, যেখানে বায়ার্ন মিউনিখের ডিফেন্ডার জেরোমে বোয়াটেং কাটা গাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন।

তৎকালীন সময়ে বেশ সমালোচিত হওয়া বোয়াটেং, পাঁচ বছর পর কোভিড-১৯ এর বিধিনিষেধের সময় অলস সময় কাটাতে গিয়ে টুইটারে লাইভ প্রশ্নোত্তর পর্ব (Q&A) শুরু করে এক মারাত্মক ভুল করে বসেন।

এক রসিক ভক্ত প্রশ্ন করে বসেন: “মেসি যখন আপনার সাথে ‘ওই কাজটা’ করেছিল, তখন আপনার মাথায় কী ঘুরছিল? আপনি জানেন আমি কোনটার কথা বলছি #AskJerome”।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন হাসির বন্যা বয়ে গেল।

বোয়াটেংয়ের জবাব ছিল, “সত্যি বলতে, আমি দেখতে চাই আপনাদের প্রত্যেকে মেসির বিপক্ষে কীভাবে ডিফেন্ড করেন।”

মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ার শুধু একটি স্থায়ী প্রতিভার গল্পই নয়, বরং সূক্ষ্ম বিবর্তনেরও গল্প।
মাইকেল কক্স কয়েক বছর আগে তার একটি চমৎকার আর্টিকেলে লিওনেল মেসির গ্রেটনেসের (সেরা হওয়ার) ১০টি ধাপ তুলে ধরেছিলেন (যদিও সেই লেখাটিকে এখন হয়তো ১১ বা ১২টি ধাপে আপডেট করার প্রয়োজন পড়বে)। ডিফেন্স-চেরা পাস দেওয়াটা মেসির খেলার এমন একটি অংশ যা সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৫-১৬ মৌসুমে এটি চরম আকার ধারণ করে, যখন তিনি নেইমার এবং লুইস সুয়ারেজের সাথে এমন এক ফরোয়ার্ড লাইনের অংশ ছিলেন যা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ছিন্নভিন্ন করে দিত।

সেই মৌসুমে মেসি প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৩.৪টি থ্রু-বল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যা ২০১৭ সালের পর থেকে প্রিমিয়ার লিগের যেকোনো খেলোয়াড়ের এক মৌসুমে গড়া সর্বোচ্চ রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি।

রিয়াল সোসিয়েদাদের সাবেক মিডফিল্ডার ডেভিড জুরতুজা, যিনি মেসির বিপক্ষে ১৪ বার খেলেছেন, ২০২৩ সালে দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেছিলেন, “আমি অনেক বড় বড় খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলেছি, কিন্তু মেসির মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে। এটা বলছি না যে সে (অন্যদের চেয়ে) ভালো ছিল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো শারীরিকভাবে অনেক বেশি ফিট ছিল, শারীরিকভাবে অনেক বেশি স্পেকটাকুলার ছিল। কিন্তু মেসি ছিল নিখাদ প্রতিভা। সে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এক্সিলারেট করতে (গতি বাড়াতে) পারত, তবে আসল ব্যাপার ছিল তার বুদ্ধিমত্তা। সে অন্য সবার আগে সবকিছু দেখতে পেত।”

“আপনি যখন তার সাথে মাঠে নামবেন, তখন বুঝতে পারবেন সে কত দ্রুত কাজগুলো করে। এটা ভয়ংকর। আপনি টিভিতে সেটা বুঝতে পারবেন না। এটা পাশবিক।”
বোঝাই যাচ্ছে, মেসির মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে এক ধরনের রহস্যময়তা কাজ করে, এবং এটি নানাভাবে প্রকাশ পায়।

খেলোয়াড়রা প্রায়ই কথা বলেন কীভাবে মেসি তাদের মনোযোগের স্তর বাড়িয়ে দিতে বাধ্য করেন। ভারান এবং ডিমেরিটের ভাষায়, মাঠে পা রাখার সাথে সাথেই “নিজের খেলার মান বাড়ানোর” প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হয়।

তবে মেসির উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করারও কারণ হতে পারে। বুঝতে না পারলেও, খেলোয়াড়রা তার দিকে আকৃষ্ট হয়, বল পায়ে তাকে দেখে এবং তার সৃষ্ট ভয়ের কারণে প্রায় হিপনোটাইজড (সম্মোহিত) হয়ে যায়।

“যখন আপনি শীর্ষ খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলবেন, তখন কখনো কখনো তাদের খেলা আটকাতে আপনি খুব আক্রমণাত্মক হতে চাইবেন,” ভারান ব্যাখ্যা করেন। “কিন্তু কখনো কখনো আপনাকে এটাও বুঝতে হবে যে বিপদজনক এলাকায় আকৃষ্ট হওয়া যাবে না। কারণ মেসি যখন পায়ে বল নিয়ে এগোয়, তখন আসল বিপদ হলো অন্য পাশে থাকা খেলোয়াড়রা। সবাই মেসির দিকে ছুটে যায় আর তারা বলটা অন্য পাশে পাস করে দেয়। তখন একটা প্যানিক বা আতঙ্ক তৈরি হয়। এরপর যখন আপনি মোটেই আশা করছেন না, তখন তারা আবার মেসিকে বল ফেরত দেয়।”

কিন্তু যদি উল্টোটা ঘটে এবং মনে হয় যে মেসি আপনার দিকেই তাকিয়ে আছেন?

২০১৭ সালে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইর বিপক্ষে ম্যাচের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে সেল্টিকের ম্যানেজার ব্রেন্ডন রজার্স একটি গল্প বলেছিলেন। আগের মৌসুমে বার্সেলোনার কাছে হারের পর তার ক্রোয়েশিয়ান সেন্টার-ব্যাক জোজো সিমুনোভিচের সাথে হওয়া কথোপকথন নিয়ে ছিল সেই গল্প।

রজার্স বলেছিলেন, “আমার মনে আছে গত বছর জোজোর সাথে কথা বলছিলাম। আমি বলেছিলাম, ‘বলো তো, মেসির মুখোমুখি হওয়াটা কেমন ছিল?’”

“সে আমাকে বলেছিল, ‘আমি যতবার পেছনে ঘুরে তাকাতাম, দেখতাম সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!’

“জোজো বলেছিল, ‘সে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, আর এটা আমাকে নার্ভাস করে দিয়েছিল’।”

রজার্স হাসলেন। “এটাই হলো এই মানের খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্য। মেসি এবং সুয়ারেজ বলের কাছে যায় না; বল তাদের কাছে আসে। তারা শুধু ফাঁকা জায়গা খোঁজে। যখন তারা কাউকে নড়তে দেখে, তখন তারা মুভ করে।”

প্রায় এক দশক পর সেই মন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিলে সিমুনোভিচ হাসেন।
“ম্যাচের সময় আপনি শুধু বলের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবেন না, আপনাকে চারপাশে তাকাতে হবে, বিশেষ করে বল যখন বিপরীত দিকে থাকে,” তিনি বলেন। “ডিফেন্ডার হিসেবে, আমাদের চারপাশের খেলোয়াড় এবং ফাঁকা জায়গা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। তাই কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি কয়েকবার মাথা ঘুরিয়েছিলাম, আর প্রতিবারই দেখলাম যে সে (মেসি) হাঁটছে এবং বল বিভিন্ন জায়গায় থাকার সময় আমার পজিশনের দিকে তাকিয়ে আছে।”

“এটা খুবই অদ্ভুত ছিল যে, তাদের পায়ে যখন বল থাকত তখন সে খেলার দিকে তাকিয়ে থাকত না। সে শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন আমি জানি, এটা সে করত (ডিফেন্ডার হিসেবে) আমাদের পজিশন বোঝার জন্য এবং কোথায় দৌড়ালে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যাবে ও আপনাকে শাস্তি দেওয়া যাবে, তা খোঁজার জন্য।”

কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপে মেসির বয়স ছিল ৩৫। তিনি তখনো একজন জিনিয়াস ছিলেন। কিন্তু ভিন্ন ধরনের এক জিনিয়াস।

অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন সহকারী কোচ মিউলেনস্টিন বলেন, “আপনি যদি ২০০৯ সালের মেসিকে দেখেন, তখন সে তার সেরা ফর্মেও পৌঁছায়নি। তবুও সে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে দৌড়ে সবাইকে পেছনে ফেলে দিতে পারত। ২০২২ সালে সে আর সেটা করতে পারত না। আমাদের ম্যাচে সে তার ৮০ শতাংশ সময় শুধু হেঁটে বেড়িয়েছে আর ফাইনাল থার্ডে (আক্রমণভাগে) গিয়ে জ্বলে উঠেছে, যেখানে সে জানে যে সে এমন কিছু করতে পারবে যা ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেবে।”

“তবে সে যখন হাঁটে, তখনও আপনি তাকে উপেক্ষা করতে পারবেন না। সে তখনো গেম রিড করছে (খেলার পরিস্থিতি বুঝছে) এবং বল কোথায় যাবে তা অনুমান করছে। আর এর জন্য তার মাথায় আগে থেকেই একটা পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকে।”

অস্ট্রেলিয়া শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল। মিউলেনস্টিনের কথা শোনাটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে তারা এই ব্যাপারটার ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি হাঁটা মেসি বল কেড়ে নেওয়ার জন্য কোনো তাগিদ দেখাবেন না।

“আমরা জানতাম যে তার কারণে আমরা পেছন থেকে বিল্ড-আপ করে খেলতে পারব,” মিউলেনস্টিন বলেন। “আমাদের (মিডফিল্ডার) অ্যারন মুয়ি সবসময় মেসির পেছনে আসত, আর অ্যারন বল পায়ে বেশ স্থিতিশীল। মেসির পেছনে যে-ই থাকুক না কেন, তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমাদের কিছু বিল্ড-আপ কৌশল ছিল।”

“আমরা জানতাম সে ডিফেন্ড করবে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্জেন্টিনা প্রেসিং করত না, আর যদি তারা প্রেস করত, তবে মেসিই তার সূচনা করত। আমাদের সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়েছিল। সেক্ষেত্রে আমাদের কৌশল হতো লম্বা শট খেলা এবং ফার্স্ট ও সেকেন্ড বলের জন্য লড়াই করা।”

“আমরা ভুলটা করেছিলাম যখন বলটা গোলরক্ষকের কাছে দেওয়া হয়েছিল; সে একটু বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিল, এবং আমরা দ্বিতীয় গোলটা খেয়ে যাই।”

“কিন্তু আপনি যদি আবার ম্যাচটা দেখেন, আমরা পেছন থেকে বিল্ড-আপ করে খেলতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম আর এর একমাত্র কারণ ছিল আমরা জানতাম মেসি ফিরে এসে তাড়া করবে না। (২০০৯ এবং ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে) বার্সেলোনার বিপক্ষে আমরা যা করতে পারতাম, এটা ছিল তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সেটআপ।”

৩৫-এর কোঠায় থাকা মেসি যে তরুণ বয়সের মতো বল হারানোর পর বল কেড়ে নেওয়ার জন্য পাগলের মতো ছুটে বেড়াবেন না, এটা মোটেও আশ্চর্যের কিছু নয়। তবে বল পায়ে, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের জাদুতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এবং ভাগ্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা তার কাছে চিরন্তন মনে হয়, যেন তিনি বয়সের কাঁটাকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন।

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে, মেসি নিজেকে জোসকো গভারডিওলের মুখোমুখি আবিষ্কার করেন। গভারডিওল মেসির চেয়ে ১৫ বছরের ছোট, ৬ ইঞ্চি লম্বা এবং দৃশ্যত অ্যাথলেটিক ও শারীরিকভাবেও বেশি শক্তিশালী। বস্তুত, এটি ছিল একটি অসম লড়াই। মেসি গভারডিওলকে ছিটকে ফেললেন।

গভারডিওলকে থামিয়ে আবার দৌড় শুরু করিয়ে, যে কৌশলটি ডিফেন্ডারদের মনে একটি মিথ্যা নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। এবং তারপর একবার এদিকে যাওয়ার ভান করে অন্যদিকে গিয়ে, মেসি এমন এক জায়গা তৈরি করলেন যেখানে মনে হচ্ছিল কোনো জায়গাই নেই। আর সেখান থেকেই তিনি হুলিয়ান আলভারেজকে দিয়ে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলটি করান।

প্রিমিয়ার লিগ, বুন্দেসলিগা, এনএফএল এবং মেজর লিগ বেসবলের পেশাদার ক্লাবগুলোর সাথে কাজ করা সাবেক ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড স্প্রিন্ট কোচ জোনাস ডোডো কয়েকদিন পর দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেছিলেন, “সে দিক পরিবর্তন করার জন্যই তৈরি হয়েছে। তার শরীরের গঠনটাই এমন। তার শরীরটা লম্বা এবং পাগুলো ছোট, যার মানে হলো সে চটপটে হওয়ার জন্যই তৈরি।”

আটলান্টা ইউনাইটেডের হয়ে খেলা ট্রিস্টান মুয়ুম্বাও এর সাথে একমত। ২০২৩ সালে মেসি পিএসজি ছেড়ে এমএলএস-এ যোগ দেওয়ার পর থেকে মুয়ুম্বা আধা ডজনেরও বেশিবার এই আর্জেন্টাইনের মুখোমুখি হয়েছেন।

“পুরো ব্যাপারটা নির্ভর করে সে কীভাবে তার শরীরকে ব্যবহার করে তার ওপর,” মুয়ুম্বা বলেন। “সে খুবই বুদ্ধিমান এবং সে জানে প্রতিটি মুহূর্তে কীভাবে তার শরীরের পজিশন ঠিক রাখতে হয়। তার শরীরের নিচের অংশটি খুবই অ্যাথলেটিক। আপনি প্রায়ই শুনবেন মেসি ছোটখাটো, কিন্তু সে শক্তপোক্ত এবং সে পায়ের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। সে বেশ দৃঢ় এবং চমৎকারভাবে তার শরীরকে ব্যবহার করে।”

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থক হিসেবে বেড়ে ওঠা মুয়ুম্বা জানান, তিনি একসময় রোনালদোকে বেশি পছন্দ করতেন, যতক্ষণ না তিনি “বাস্তবতা বুঝতে পারেন”। মুয়ুম্বা মেসি সম্পর্কে এমন একটা কথা বলেন যা ফুটবলারের চেয়ে মানুষ মেসির সাথেই বেশি যায়।

“সে খুব একটা কথা বলে না। আর আমি স্প্যানিশও বলতে পারি না। কিন্তু সে হয়তো আপনাকে দেখে একটু হাসবে বা আপনার হাতে হাত মেলাবে,” মুয়ুম্বা বলেন, যার বাড়িতে ফ্রেমে বাঁধানো মেসির একটি জার্সি আছে।

“আমি সবসময় তার বিপক্ষে খেলাটা উপভোগ করেছি, কারণ তার নিজের সম্পর্কে কোনো অহংকার আছে বলে মনে হয় না। তার কাছে সহজেই যাওয়া যায় এবং তার মধ্যে এক ধরনের দয়া বা বিনয় কাজ করে।”

আর এই বিনয়টাই আপনাকে ধ্বংস করে দেবে, ঠিক যখনই লিওনেল মেসির পায়ে একটা ফুটবল থাকবে।

দ্য অ্যাথলেটিক পত্রিকা থেকে অনুবাদ। জায়গার স্বল্পতার কারণে বেশ কিছু ইনফরমেশন বাদ দিতে হয়েছে।

অন্যদেরও পড়তে দিন