মূল লেখায় যান
রাইসুল সোহান
সব লেখা

সিনেমার নাম ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’

সিনেমা

১৯৫৩ সালে মুম্বাই থেকে ঢাকায় ফিরলেন এক তরুণ। মুম্বাইয়ে সিনেমার পেছনে ঘোরাঘুরি করে মাসে ত্রিশ টাকা রোজগার হতো তার। ঢাকায় ফিরে ঢুকলেন এভারগ্রিন নামের প্রচার সংস্থায়। কাজ, হাতে সিনেমার পোস্টার আঁকা।

তিন বছর পর এই দেশের প্রথম সবাক সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পেলো। ওই সিনেমার পোস্টার আঁকলেন এই তরুণ। নাম সুভাষ দত্ত। ডাকনাম পটলা। জন্ম দিনাজপুরের মুনশিপাড়ায় মামার বাড়িতে, গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়।

তারপর ‘মাটির পাহাড়’-এ আর্ট ডিরেকশন, এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কমেডি চরিত্রে অভিনয়, ‘হারানো দিন’-এর সাফল্য। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দেখার পর তার মাথায় সিনেমা নির্মাণের ভূত চাপলো। ১৯৬৪ সালে বানালেন ‘সুতরাং’। পরের বছর ফ্রাঙ্কফুর্ট চলচ্চিত্র উৎসবে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ সিনেমার পুরস্কার এলো। ওই সিনেমা দিয়েই পর্দায় এলেন কবরী।

ষোলো বছর পর সুভাষ দত্ত আবার পোস্টারে ফিরলেন। এবার পোস্টারে সিনেমার নাম বড় করে লেখা হলো না, নায়িকার মুখও বসলো না। লেখা হলো একটা দাবি:

“লাঞ্ছিত নারীত্বের মর্যাদা দাও, নিষ্পাপ সন্তানদের বরণ কর।”

যে লোক নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন অন্যের সিনেমার বিজ্ঞাপন এঁকে, তিনি নিজের সিনেমার বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপন রাখলেন না। রাখলেন একটা রাজনৈতিক দাবি। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে এমন পোস্টার আর হয়নি।

সিনেমার নাম ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭২ সালের ৮ নভেম্বর, ঈদুল ফিতরে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঈদুল ফিতর। ওই ঈদে দর্শক হলে ঢুকে দেখলো, নয় মাসে তাদের মা-বোনদের সঙ্গে কী হয়েছিল। কেউ কেউ মুক্তির তারিখ ১০ নভেম্বর বলেন, তবে ঈদের ছবি হিসেবেই এটি এসেছিল।

হিন্দু বিবাহে আগুন সাক্ষী থাকে। বর ও কনে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড ঘিরে সপ্তপদী হাঁটে, আর প্রতিটি পদক্ষেপে একটা করে প্রতিজ্ঞা করে। ওই প্রতিজ্ঞা ভাঙা যায় না, কারণ আগুন দেখে ফেলেছে। ‘অগ্নিসাক্ষী’ শব্দের মানে তাই, আগুনকে সাক্ষী রেখে বাঁধা সম্পর্ক।

সুভাষ দত্ত এই শব্দের আগে বসালেন ‘অরুণোদয়ের’। সূর্য ওঠার মুহূর্তের আগুন। স্বাধীনতার ভোর।

প্রশ্নটা তাহলে সহজ। এই বিয়েতে বর কে, আর কনেই বা কে?

সিনেমাটিকে সাধারণত বীরাঙ্গনাদের মর্যাদা ও স্বীকৃতির পক্ষে দাঁড়ানো একটি মানবিক গল্প হিসেবেই দেখা হয়। সেটা ভুল নয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যায় ‘অগ্নিসাক্ষী’ নামের ভেতর সুভাষ দত্ত যে আরেকটি অর্থ লুকিয়ে রেখেছেন, সেটি ধরা পড়ে না।

আমার কাছে মনে হয়, সিনেমাটি নিজেই একটা বিবাহ অনুষ্ঠান। কনের নাম রোমেনা। বরের নাম বাংলাদেশ সমাজ। আর আগুনের জায়গায় সুভাষ দত্ত বসিয়ে দিয়েছেন দর্শককে। হলের অন্ধকারে বসা মানুষ প্রজেক্টরের আলোয় সাক্ষী হচ্ছে। পোস্টারের ওই দাবি আসলে বিয়ের কবুল। পর্দার আলোকে সাক্ষী মেনে সুভাষ দত্ত জাতিকে দিয়ে একটা প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।

বিয়েটা টেকেনি। কেন টেকেনি, ওই আলাপে পরে আসছি।

তার আগে বাঙালির স্মৃতিতে আগুন আর নারীর যে সম্পর্ক গাঁথা আছে, সেটা মনে করা দরকার। রামায়ণে রাবণের বন্দিদশা থেকে ফিরে আসার পর সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। তিনি আগুনে প্রবেশ করেন, অগ্নিদেব নিজে তাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। তবু বহু পরে এক ধোপার কটু মন্তব্যের পর রাম তাকে নির্বাসনে পাঠান।

বীরাঙ্গনাদের নিয়তিটাও যেন এমনই। আগুনের পরীক্ষা পেরিয়েও শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরেই তাদের জায়গা হয়নি।

সুভাষ দত্ত এখানে খুব সচেতনভাবেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তার সিনেমায় আগুন রোমেনার পরীক্ষা নেয় না, পরীক্ষা নেয় সমাজের। প্রশ্নটা ‘মেয়েটি শুদ্ধ কি না’ থেকে সরে গিয়ে হয়ে গেছে ‘তোমরা মানুষ কি না’। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে এমন প্রশ্ন তোলা সহজ ছিল না।

গল্পটা সংক্ষেপে বলি।

কুসুমপুর গ্রামের মেয়ে রোমেনা। তরুণ কৃষক আসাদের সঙ্গে তার প্রেম। বাড়ির সবাই আসাদকে পছন্দ করে, বিয়েতে কোনো বাধা নেই। গ্রামেরই আরেক তরুণ বদরুদ্দিন রোমেনাকে ভালোবাসে, নীরবে।

একদিন গ্রামে শুটিং দল আসে। সিনেমার নায়ক আনোয়ার হোসেন, পরিচালক সুভাষ দত্ত।

একটা বিষয় এখানে আলাদা করে খেয়াল করার মতো। আনোয়ার হোসেন এই সিনেমায় নিজের নামেই অভিনয় করেছেন। সুভাষ দত্তও আছেন নিজের নামেই। অর্থাৎ ১৯৭২ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে একজন নির্মাতা নিজের সিনেমার গল্পের ভেতর নিজের শুটিং ইউনিটকেই নিয়ে এসেছেন, এমনকি নিজেকেও চরিত্র হিসেবে হাজির করেছেন। বাংলা সিনেমা তখনো এই খেলা শেখেনি।

তারপর পঁচিশে মার্চ। গণহত্যার স্থিরচিত্র। ট্রাক ভরে গ্রামে ঢোকে পাকিস্তানি সেনা। ঘরে ঘরে আগুন, লুট, খুন। শিশুদের হত্যা করা হয়। নারীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাম্পে। রোমেনার বাবা-মা খুন হন, ছোট ভাইবোন লুকিয়ে বাঁচে, আসাদ গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যায়। রোমেনাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

বদরুদ্দিনসহ গ্রামের তরুণেরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। শরণার্থীর ঢল নামে সীমান্তের দিকে। ওই ঢলে মিশে যান আনোয়ার হোসেনও।

সীমান্তের পথে আনোয়ার হোসেন ধরা পড়েন। বন্দিশিবিরে বসে তিনি দেখেন বাঙালি নারীর উপর নির্যাতন, দেখেন মুক্তিযোদ্ধা হত্যা, দেখেন যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কহীন গ্রামের মানুষকেও গুলি করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুভয়ে তিনি কাঁপতে থাকেন। তারপর পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা তাকে ছেড়ে দেয়। কারণ তিনি সিনেমার নায়ক। কারণ তিনি ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র নায়ক। আমার মনে হয়, এতদিন ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তার বেশিরভাগই এই দিকটা এড়িয়ে গেছে।

সিরাজউদ্দৌলা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি হেরে যান, আর তারপর প্রায় দুইশো বছর বাংলা আর স্বাধীন হয়নি। ১৯৬৭ সালে খান আতাউর রহমান ওই গল্প নিয়ে সিনেমা বানান, নামভূমিকায় আনোয়ার হোসেন। ওই একটি চরিত্র তাকে আজীবনের নাম দিয়ে দেয়, মুকুটহীন নবাব। বাঙালির পর্দায় স্বাধীনতার মুখ বলতে তখন ওই মুখ।

এবার দুটো ঘটনাকে পাশাপাশি রাখুন। পর্দায় যে লোক বাংলার শেষ স্বাধীনতার প্রতীক, বাস্তবের যুদ্ধে দখলদার বাহিনী তাকে ছেড়ে দেয়। ছেড়ে দেয় কারণ তারা তাকে নিরীহ মনে করে। এবং তারা ভুল করে না। তিনি সত্যিই নিরীহ। ছাড়া পেয়ে তিনি একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দেখা করেন, তারও যুদ্ধে যেতে ইচ্ছা হয়, তারপর মৃত্যুভয় তাকে গিলে ফেলে। তিনি যেতে পারেন না।

সিনেমায় পরে আনোয়ার হোসেন নিজেই বুঝতে পারেন, পর্দায় বীরের অভিনয় করা সহজ, বাস্তবে বীর হওয়া সহজ নয়।

গ্রিক নাটকে অভিনেতাকে বলা হতো hypokrites। শব্দটির মূল অর্থ ছিল উত্তরদাতা বা ব্যাখ্যাকারী। পরে এই শব্দ থেকেই ইংরেজি hypocrite এসেছে। অর্থাৎ অভিনয় আর ভণ্ডামির মধ্যে শব্দের ইতিহাসেই একটা অদ্ভুত যোগ আছে। সুভাষ দত্ত এই সিনেমায় সেটাকেই যেন সামনে নিয়ে আসেন।

তবে আসল টুইস্ট এখানে নয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সুভাষ দত্তও পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। উর্দু সিনেমায় কাজ করার সুবাদে তখন পাকিস্তানি দর্শকদের কাছেও তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন। অর্থাৎ আনোয়ার হোসেনের চরিত্রে সুভাষ দত্ত যে ঘটনা লিখেছেন, ওটা তার নিজের জীবনের ঘটনা। তিনি নিজের অপরাধবোধ অন্য একজন অভিনেতার শরীরে বসিয়ে দিয়েছেন, এবং সেই অভিনেতাকে বেছে নিয়েছেন যিনি এদেশের পর্দায় স্বাধীনতার সবচেয়ে পরিচিত মুখ। ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার একজন হিন্দু বাঙালি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ছাড়া পেলেন, কারণ উর্দু সিনেমায় তার মুখ পরিচিত ছিল। যে জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই পরিচিতিই তাকে বাঁচিয়ে দিল। সুভাষ দত্ত নিজে ঘটনাটাকে ঠিক এভাবে দেখেছিলেন কি না, সেটা আমরা জানি না। তবে পরে নিজের সিনেমায় তিনি এই অভিজ্ঞতাকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
তাই ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ নিছক বীরাঙ্গনার সিনেমা নয়। এটি একটা শিল্পীর জবানবন্দি। যে ইন্ডাস্ট্রি যুদ্ধের সময় খুব বেশি কিছু করতে পারেনি, সেই ইন্ডাস্ট্রির একজন মানুষ যুদ্ধের পর ক্যামেরা তুলে নিজের দিকেই তাকালেন।

আর জবানবন্দির শেষে তিনি প্রায়শ্চিত্তের একটাই পথ খুঁজে পেয়েছেন। যুদ্ধে যেতে পারেননি বলে যুদ্ধশেষে তিনি একটা শিশু কোলে তুলে নেন।

সিনেমার নাম ‘অগ্নিসাক্ষী’, কিন্তু সেই দৃশ্যের সাক্ষী আগুন নয়, পুকুরের জল।

খবর আসে, কয়েকজন নারীকে বিবস্ত্র করে পুকুরে নামিয়ে রেখেছে পাকিস্তানি সেনারা, চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। কমান্ডার আসাদের দলকে পাঠান। রোমেনাকে উদ্ধার করতে গিয়ে শহীদ হয় আসাদ। রোমেনাকে ক্যাম্প থেকে বের করে আনে বদরুদ্দিন, পরে সে নিজেও রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারায়।

দৃশ্যটা কল্পনা থেকে নেওয়া নয়। উনিশশো একাত্তরে বহু জায়গায় ঠিক এই কাজ করা হয়েছিল, নারীদের পোশাক কেড়ে নিয়ে পানিতে নামিয়ে রাখা হতো যাতে তারা পালাতে না পারে, যাতে লজ্জা নিজেই শিকল হয়ে ওঠে। সুভাষ দত্ত ঘটনার এক বছরের মাথায় এই দৃশ্য পর্দায় তুলেছেন।

সীতার পরীক্ষাটা ছিল আগুনে, আর অগ্নিদেব স্বয়ং সাক্ষ্য দিতে নেমে এসেছিলেন। কুসুমপুরের পুকুরে কোনো দেবতা নামে না। রোমেনার হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার কেউ থাকে না।

তাহলে সাক্ষী কে? সিনেমার পর্দার সামনে বসে থাকা দর্শকই। এই কারণেই ‘অগ্নিসাক্ষী’ নামটা আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের আসরে আগুন যেমন সাক্ষী থাকে, এই সিনেমায় সেই সাক্ষীর জায়গায় বসানো হয়েছে দর্শককে। আর জাতি হিসেবে আমরা ওই কাজে ফেল করেছি।

সিনেমার সংগীত পরিচালক সত্য সাহা। কিন্তু যে গান সিনেমাকে ধরে রাখে, ওটা তার সুর নয়। ওটা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, আপেল মাহমুদের কণ্ঠে, “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।”

কথা লিখেছিলেন গোবিন্দ হালদার, সুর করে গেয়েছিলেন আপেল মাহমুদ নিজেই। ১৯৭১ সালের জুন মাসে গানটি বেতারে রেকর্ড হয়। রণাঙ্গনের ছেলেরা এই গান শুনে অস্ত্র তুলেছে। যুদ্ধের সময় ওই “একটি ফুল” মানে ছিল দেশ। সুভাষ দত্ত গানটিকে সিনেমার শেষ দিকে বসিয়ে অর্থ বদলে দিলেন। তার সিনেমায় ওই একটি ফুল হয়ে দাঁড়ালো রোমেনার গর্ভের সন্তান। গান বলছিল, একটা ফুল বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করেছি। সিনেমায় সুভাষ দত্ত প্রশ্ন করলেন, তাহলে এই ফুলটা কেন বাঁচাবে না? প্রশ্নটা যতটা কাব্যিক শোনায়, ১৯৭২ সালের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

স্বাধীনতার পরপরই সরকার গঠন করে নারী পুনর্বাসন বোর্ড। বোর্ডের প্রাথমিক জরিপে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা এসেছিল দুই লাখ আটষট্টি হাজার দুইশো। ওই সময় একটি ইতালীয় চিকিৎসক দল বলেছিল, সংখ্যাটা চার লাখ বা তার বেশিও হতে পারে। গর্ভপাতের জন্য ঢাকা ও দেশের নানা জায়গায় খোলা হয় সেবা সদন নামের ক্লিনিক, সংখ্যায় বাইশটি। ব্রিটিশ, আমেরিকান ও অস্ট্রেলীয় চিকিৎসকেরা স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে কাজ করেন। হিসাব বলে, ওই সময় ঢাকার বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রায় তেইশ হাজার গর্ভপাত করানো হয়েছিল। যাদের গর্ভ আর নষ্ট করা যায়নি, তাদের সন্তান জন্মায় ওই সেবা সদনগুলোতেই, সংখ্যায় তিনশো থেকে চারশো।

সরকার জারি করে ‘বাংলাদেশ পরিত্যক্ত শিশু (বিশেষ বিধান) আদেশ, ১৯৭২’। মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটি ঢাকায় খোলে শিশু ভবন। মন্ট্রিয়লভিত্তিক দত্তক সংস্থা ফ্যামিলিজ ফর চিলড্রেন এগিয়ে আসে। এবং ১৯৭২ সালের ১৯ জুলাই প্রথম দফায় পনেরোজন যুদ্ধশিশু কানাডায় পৌঁছায়।

সুভাষ দত্তের সিনেমা মুক্তি পায় ৮ নভেম্বর ১৯৭২। তার প্রায় চার মাস আগেই প্রথম দফার যুদ্ধশিশুদের কানাডায় পাঠানো হয়ে গেছে। ফলে সিনেমার শেষদিকে আনোয়ার হোসেন যখন একটি যুদ্ধশিশুকে কোলে তুলে তাকে গ্রহণ করার কথা বলছেন, বাস্তবে ততদিনে সেই শিশুদের একটি দল দেশ ছেড়ে চলে গেছে।

সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলো শিশুদের ডাকতো ‘অবাঞ্ছিত’ কিংবা ‘শত্রুর সন্তান’ বলে। গবেষক মুস্তাফা চৌধুরীর হিসাবে যুদ্ধশিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। তাদের বড় অংশ কানাডা ও ইউরোপে বড় হয়েছে। যারা এদেশে থেকে গিয়েছে, তারা ‘জারজ’ ডাক শুনে বড় হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’কে শুধু যুদ্ধশিশুদের গ্রহণ করার একটি আবেদন হিসেবে দেখলে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যুদ্ধশিশুদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা যখন বাস্তবে শুরু হয়ে গেছে, তখন একজন নির্মাতা ঈদের ছবির মধ্যেই তার বিপরীত এক প্রশ্ন তুলছেন। পোস্টারে লিখছেন তাদের বরণ করার কথা, আর শেষ দৃশ্যে একটি শিশুকে তুলে দিচ্ছেন দর্শকের সামনে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমায় এমন অবস্থান খুব বেশি দেখা যায়নি।

‘অরুণ’ নামের পেছনে যে পুরাণ আছে, সেটাও এই সিনেমার শেষ দৃশ্যের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। মহাভারতের আদিপর্ব বলছে, ঋষি কশ্যপের স্ত্রী বিনতা দুইটি ডিম পাড়েন। বহু বছর কেটে যায়, কিছুই ফোটে না। অধৈর্য হয়ে বিনতা একটি ডিম নিজে ভেঙে ফেলেন। ভেতরে যে সন্তান, তার শরীরের নিচের অংশ তখনো তৈরি হয়নি। সময়ের আগে জন্ম নেওয়া এই অসম্পূর্ণ সন্তান মাকে অভিশাপ দেয়, তুমি দাসী হবে। তারপর সে আকাশে উঠে যায় এবং সূর্যের রথের সারথি হয়। তার নাম অরুণ। ভোরের আকাশে সূর্যের ঠিক আগে যে লালচে আভা, ওটাই সে। অর্থাৎ অরুণোদয় মানে নিখুঁত কোনো জন্ম নয়। অরুণোদয় মানে সময়ের আগে ভেঙে ফেলা খোলস থেকে বেরিয়ে আসা অসম্পূর্ণ এক শিশু, যে মাকে অভিশাপ দিয়ে গিয়েছে, আর যাকে ছাড়া সূর্য উঠতে পারে না।

সুভাষ দত্ত এই পুরাণ মাথায় রেখে নাম দিয়েছেন, এমন দাবি আমি করব না। সম্ভবত করেননি। কিন্তু তার সিনেমার শেষ দৃশ্যে যে শিশু আনোয়ার হোসেনের কোলে উঠে আসে, সেই শিশুকে অরুণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার একটা সুযোগ তৈরি হয়। যুদ্ধ নামের ভাঙা খোলস থেকে সময়ের আগে বেরিয়ে আসা সন্তান। আর তার মা রোমেনা, যাকে সমাজ সত্যি সত্যিই দাসত্বের সমান জায়গায় নামিয়ে রাখলো, তিনি বিনতা।

পুরাণের গল্পে অরুণের আরেকটি ভূমিকা আছে। ব্রহ্মা তাকে সূর্যের সামনে রাখেন, যাতে সূর্যের তীব্র তাপ পৃথিবীর ওপর সরাসরি না পড়ে। অর্থাৎ যে শিশুটি অসময়ে জন্মেছিল এবং যার শরীর পুরোপুরি তৈরি হয়নি, পরবর্তী সময়ে সেই অরুণই সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়ানোর কাজ পায়।

এই ভাবনাই যেন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধশিশুকে কোলে তুলে নেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আনোয়ার হোসেনের চরিত্রটি বুঝতে পারে, এই শিশুরাও স্বাধীনতার সময়েই জন্মেছে। তাদেরও এই দেশের বাইরে ঠেলে দেওয়ার কোনো কারণ নেই।

রোমেনা চরিত্রে ববিতা। এটা তার জীবনের অন্যতম বড় কাজ। এই সিনেমার পরের বছর তিনি চলে যান সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’-এ, অনঙ্গ বৌ চরিত্রে, তেতাল্লিশের মন্বন্তরের গল্পে।

পরপর দুই সিনেমায় ববিতা এমন দুইজন নারী হলেন, যাদের শরীরের উপর দিয়ে একটা জাতির বিপর্যয় গড়িয়ে গেছে। একবার দুর্ভিক্ষ, একবার ধর্ষণ। বাংলা সিনেমায় এমন পরপর দুইটি চরিত্র আর কোনো অভিনেত্রী পেয়েছেন কি না, ভাবার মতো প্রশ্ন। আসাদ চরিত্রে উজ্জ্বল করেছেন যুদ্ধের সেই কাজ, যা করা তুলনামূলক সহজ। সে বন্দুক তুলেছে, সে মরে গেছে, সে শহীদ হয়েছে। বদরুদ্দিনও তাই। সুভাষ দত্ত এই দুই তরুণকে সিনেমা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন ইচ্ছা করেই। কারণ শহীদ হওয়া কঠিন, কিন্তু শহীদকে সম্মান দেওয়া কঠিন নয়। আমরা ওই কাজে অভ্যস্ত।

সিনেমায় রোমেনাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, কারণ যুদ্ধের পর তার জীবনটাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। আর আনোয়ার হোসেন বেঁচে থাকেন এমন এক মানুষ হিসেবে, যে যুদ্ধে যেতে পারেনি। তার জন্য সেই বেঁচে থাকাই এক ধরনের বোঝা। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তার সামনে আর কোনো বীরের ভূমিকা নেই। আছে শুধু যারা ফিরে আসেনি, তাদের রেখে যাওয়া দায় নিজের কাঁধে নেওয়া।

সুভাষ দত্ত ১৯৭২ সালে দর্শককে সাক্ষী মেনে যে বিয়ে পড়িয়েছিলেন, রাষ্ট্র তার জবাব দিয়েছে ২০১৫ সালের অক্টোবরে। ওই মাসে প্রথমবারের মতো তেতাল্লিশজন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা পাঁচশোর কিছু বেশি।

দুই থেকে চার লাখের বিপরীতে পাঁচশো। তেতাল্লিশ বছর লেগেছে প্রথম তেতাল্লিশজনকে খুঁজে বের করতে। ততদিনে তাদের অধিকাংশই মারা গিয়েছেন, নাম বদলে অন্য জেলায় চলে গিয়েছেন, কিংবা পরিবারের ভয়ে সারা জীবন মুখ বন্ধ রেখেছেন। নীলিমা ইব্রাহিমকে সাতজন নারীর জবানবন্দি ছাপতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত, এবং তিনি লিখেছেন, তাদের নতুন করে অপমানিত করতে তার সংকোচ হচ্ছিল।

সুভাষ দত্ত মারা যান ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর। আনোয়ার হোসেন মারা যান ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। প্রথম বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার সময় তাদের কেউই আর বেঁচে ছিলেন না। যে দাবি সুভাষ দত্ত নিজের সিনেমার পোস্টারে লিখেছিলেন, সেটার পূর্ণ উত্তর পেতে আরও অনেক বছর লেগেছে। আর সেই উত্তরও আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়নি।

‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ তাই শুধু মুক্তিযুদ্ধের সময়ের একটি সিনেমা হয়ে থাকেনি। বীরাঙ্গনা, যুদ্ধশিশু আর তাদের সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সুভাষ দত্ত তুলেছিলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও সেগুলোর সবগুলোর উত্তর আমরা দিতে পারিনি।

অন্যদেরও পড়তে দিন