পাঁচ বছর বয়সে আল পাচিনোর সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র ছিল এক মাতাল। মঞ্চের কাজ করতো নানাবাড়ির বসার ঘরের মেঝে, আর দর্শকের আসনে বসতেন আত্মীয়রা। ওই অভিনয় দেখে তারা হেসে গড়িয়ে পড়তেন, যদিও ছেলেটা যে দৃশ্য করে দেখাতো, সেটা কৌতুকের দৃশ্য ছিল না।
দৃশ্যটা সে তুলে এনেছিল একটা সিনেমা থেকে। মা রোজ তাকে সিনেমায় নিয়ে যেতেন তিন-চার বছর বয়স থেকেই, সিনেমা বাচ্চার উপযোগী হোক বা না হোক। ১৯৪৫ সালের শেষে মুক্তি পাওয়া বিলি ওয়াইল্ডারের দ্য লস্ট উইকেন্ডও সে দেখেছিল মায়ের পাশে বসে। সিনেমায় রে মিল্যান্ড অভিনয় করেছিলেন এক ব্যর্থ লেখকের চরিত্রে, যে দশ দিন মদ না ছুঁয়ে থেকে আবার তলিয়ে যায়। মদ ছেড়ে দেওয়া মিল্যান্ড নেশার ঘোরে কোথায় বোতল লুকিয়েছিলেন মনে করতে পারছেন না, আর বোতলের খোঁজে ফ্ল্যাট তছনছ করে ফেলছেন। আল পাচিনোর মাথায় গেঁথে রইলো এই দৃশ্য।
নানাবাড়িতে আত্মীয়রা জমলেই তার ডাক পড়তো, মিল্যান্ডের ওই খোঁজাখুঁজির অভিনয় একবার করে দেখাতে হবে। মিল্যান্ড যতটা মরিয়া হয়ে খুঁজেছিলেন, পাচিনোও ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঠিক ততটা মরিয়া হয়ে খুঁজে দেখাতো। ঘরভর্তি হাসির রোল উঠতো। ছোট্ট অবুঝ পাচিনো শুধু মনে মনে ভাবতো, ওরা হাসছে কেন?
খাতা-কলমে পাচিনোর নাম আলফ্রেদো জেমস পাচিনো। মা তাকে ডাকতেন সনি, আল জলসনের সনি বয় গান থেকে নেওয়া নামে, আর তিন বছর বয়সেই জলসনকে নকল করে পাচিনো ওই গান গেয়ে শোনাতো। প্রায় আশি বছর পর ২০২৪ সালে আত্মজীবনী লিখতে বসে পাচিনো বইয়ের নাম রাখলেন ওই ডাকনামেই, আর প্রথম বাক্যেই জানিয়ে দিলেন, অভিনয় তিনি করে আসছেন একদম ছোট্টবেলা থেকে। বইয়ের অনেকটা জুড়ে অবশ্য সিনেমার পাশাপাশি সমান মমতায় জায়গা পেয়েছেন কয়েকজন মানুষ, যারা তার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি।
পাচিনোর বয়স যখন দুই, তখন বাবা সালভাতোরে আর মা রোজের সংসার ভেঙে গেলো। বাবা চলে গেলেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। রোজ ছেলেকে নিয়ে উঠলেন নিজের বাবা-মা জেমস আর কেট জেরার্ডির ফ্ল্যাটে, সাউথ ব্রংক্সে, চিড়িয়াখানার কাছের এক গরিব পাড়ায়। সংসার চলতো টানাটানিতে, আর ওই একঘেয়ে দিনগুলো থেকে রোজের পালানোর জায়গা ছিল সিনেমা হল। পাচিনো লিখেছেন, হলের অন্ধকারে মা লুকিয়ে থাকতে পারতেন।
রোজ সহজ মানুষ ছিলেন না। পাচিনো মাকে তুলনা করেছেন টেনেসি উইলিয়ামসের নাটকের এক ভঙ্গুর, বেসামাল চরিত্রের সঙ্গে। দুশ্চিন্তা তাকে ছাড়তো না, আর ছেলে কোথায় যাচ্ছে একদম চোখে চোখে রাখতেন। রাস্তায় বেরোতে প্রায়ই মানা করতেন। কিশোর পাচিনো এতে রেগে আগুন হতেন, তবু অনেক পরে স্বীকার করেছেন, মায়ের ওই মানাই তার জীবন বাঁচিয়েছিল। রোজের নজর যতদূর যেতো, ততদূর পর্যন্ত সনি নিরাপদ ছিল।
পঞ্চাশের দশকে সাউথ ব্রংক্সে পাচিনোর দলটা ছিল চারজনের। দলে তার সঙ্গে থাকতো ক্লিফি, ব্রুস আর পিটি। চারজন মিলে এক বাড়ির ছাদ থেকে আরেক বাড়ির ছাদে লাফিয়ে পার হতো, আর রাস্তায় নেমে গলির মুখে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাতো। তিন বন্ধুর দিন কাটতো গাড়ি চুরি করে আর নেশা করে। পেস্তা আইসক্রিমের লোভের জন্য পাচিনোকে তারা কখনো ডাকতো সনি, কখনো পিস্তাচিও। দলের সর্দার ছিল ক্লিফি, তেরো বছর বয়সেও যার প্যান্টের পেছনের পকেটে সবসময় গোঁজা থাকতো দস্তয়েভস্কির একটা বই।
নেশার প্রশ্নে অবশ্য সনি দলের বাকিদের থেকে আলাদা ছিল, আর এই পার্থক্য সবার আগে ধরেছিল ক্লিফিই। ক্লিফি বলতো, সনির নেশা লাগে না, ওর নেশা ওর নিজের মাথার ভেতরেই। আরেকটা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিলেন রোজ। ক্লিফি, ব্রুস আর পিটি পরে তিনজনই অল্প বয়সে মারা গেলো হেরোইনের মাত্রা ছাড়িয়ে। পাচিনো লিখেছেন, তিনি বেঁচে ফিরে এসেছেন, ওরা পারেনি, আর এই বেঁচে যাওয়ার কৃতিত্ব তিনি দিয়েছেন মাকে, যিনি ছেলেকে সুঁইয়ের কাছ থেকে টেনে সরিয়ে রেখেছিলেন। চুরাশি বছর বয়সে লেখা সনি বয়ের শুরুর দিকে আর শেষ পাতাগুলোয়, দুই জায়গাতেই পাচিনো ফিরে গেছেন ওই তিনজনের কাছে।
নানা জেমস জেরার্ডি জন্মেছিলেন সিসিলির এক ছোট শহরে, আর আমেরিকায় এসেছিলেন শিশু বয়সে। পেশায় ছিলেন পলেস্তারার মিস্ত্রি। পাচিনো লিখেছেন, নরম মনের উষ্ণ মানুষ জেমস বাবা-ছাড়া নাতির কাছে হয়ে উঠেছিলেন বাবা। খেলাধুলার প্রতি টান আর খেলায় দুর্বল দলের হয়ে গলা ফাটানোর অভ্যাস, দুটোই পাচিনো পেয়েছেন নানার কাছে।
ওই নানাবাড়ির পাঁচতলার সিঁড়ি ভেঙে একদিন উঠে এসেছিলেন পাচিনোর জুনিয়র হাইস্কুলের এক শিক্ষক। স্কুলের নাটকে ছেলেটার অভিনয় দেখে তিনি এতটাই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে খবরটা নিজে এসে দিয়ে গেলেন নানিকে। তার কথা ছিল একটাই, এই ছেলেকে অভিনয় চালিয়ে যেতে দিতেই হবে। তবু সতেরো বছর বয়সে পারফর্মিং আর্টসের স্কুল ছেড়ে কাজে নামতে হলো পাচিনোকে, কারণ দুশ্চিন্তার সংসারে টাকা দরকার ছিল।
১৯৬২ সালে তেতাল্লিশ বছর বয়সে মারা গেলেন রোজ, ওষুধের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায়, খুব সম্ভবত দুর্ঘটনায়। পাচিনোর বয়স তখন বাইশ। পরের বছর মারা গেলেন জেমসও। পাচিনো পরে বলেছেন, বাইশ বছর বয়সে জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুজন মানুষকে হারিয়ে তিনি তলিয়ে গিয়েছিলেন, আর ওই বছরগুলোকেই তিনি বলেছেন জীবনের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ সময়। কিছুদিন তার মাথার ওপর ছাদও ছিল না। ঝাড়ুদার, রেস্তোরাঁর এঁটো থালা তোলার ছেলে, মালপত্র টানার মজুর, এরকম নানা কাজ করে তিনি জোগাড় করতেন হার্বার্ট বার্গহফ স্টুডিওতে অভিনয় ক্লাসের খরচ।
এর বছর আটেক পর ফ্রান্সিস ফোর্ড কাপোলা দ্য গডফাদারের মাইকেল করলিওনের চরিত্রে চাইলেন পাচিনোকে। প্যারামাউন্ট চায়নি। স্টুডিওর তালিকায় ছিলেন জ্যাক নিকলসন, রবার্ট রেডফোর্ড, ওয়ারেন বেটি, রায়ান ও’নিল। কাপোলা লড়ে গেলেন, আর মাইকেল হলেন ব্রংক্সের ওই ছেলে। খবর পেয়ে পাচিনো ফোন করে নানি কেটকে জানালেন, তিনি মাইকেল করলিওনের চরিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছেন। ফোনের ওপাশে নানি বললেন, সনি, শোনো, তোমার নানা তো জন্মেছিলেন করলিওনেতেই। পালেরমো থেকে ষাট কিলোমিটারের মতো দূরের ছোট শহর করলিওনের নাম মারিও পুজো তুলে দিয়েছিলেন গডফাদারের পরিবারের পদবিতে। আট বছর আগে মারা যাওয়া জেমস জেরার্ডি নাতির প্রথম বড় চরিত্রে এভাবে ফিরে এলেন একটা পদবি হয়ে।
শুটিং শুরু হলো নিউ ইয়র্কে, বিয়ের দৃশ্য দিয়ে। ওই দৃশ্য পাচিনো আর ডায়ান কিটন দুজনেরই অপছন্দ ছিল, ফলে প্রথম কয়েক দিন তারা সেটে হাসাহাসি করে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ম্যানহাটনে ফিরে মদ খেতেন। দুজনেরই ধারণা ছিল, তারা কাজ করছেন ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সিনেমায়। স্টুডিওর কর্তারা দিনের শুটিং করা ফুটেজ দেখে বুঝতেই পারছিলেন না নায়ক কী করছেন। গুজব ছড়ালো, পাচিনোর চাকরি যাবে, সম্ভবত পরিচালকেরও। পাচিনো পরে বলেছেন, কাপোলা পাশে না থাকলে তিনি একদিন আর সেটে যেতেনই না, কারণ যেখানে কেউ তাকে চায় না, সেখানে থাকতে তিনি চাননি।
তারপর কাপোলা শুটিংয়ের সূচি উল্টে এগিয়ে আনলেন রেস্তোরাঁর দৃশ্য। বাবার ওপর হামলার বদলা নিতে মাইকেল সেখানে সোলোজো আর দুর্নীতিবাজ পুলিশ ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কিকে গুলি করে। এপ্রিলের এক রাতে পনেরো ঘণ্টা ধরে ওই দৃশ্যের শুটিং চললো। কাপোলা দৃশ্যটা স্টুডিওকে দেখালেন, আর পাচিনো থেকে গেলেন মাইকেল হয়েই।
এরপর দল গেলো সিসিলিতে, আর করলিওনের নাতি সেখানে টের পেলেন, নানা-নানির ভাষা তিনি জানেন না। ইতালীয় বলা, গাড়ি চালানো, নাচ, এর একটাও তার জানা ছিল না, অথচ সিনেমায় সিসিলির মাইকেল বিয়ের আসরে নাচে আর নতুন বউকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। সেটের এক্সট্রারা কেউ ইংরেজি বুঝতেন না, আর একদিন ধৈর্য হারিয়ে কাপোলা চেঁচিয়ে উঠলেন, তোমাকে আমি নিয়েছিলামই বা কেন? নানার শহরের নাম ততদিনে পাচিনোর চরিত্রের পদবিতে বসে গেছে, অথচ নানার মুখের ভাষা তার মুখে আসে না।
ষাটের দশকে পাচিনোর আরেকটা চাকরি ছিল স্ট্যান্ডার্ড অয়েলে, বার্তাবাহকের। একই কাজ করতেন ম্যাসাচুসেটস থেকে আসা আরেক উঠতি অভিনেতা, জন কাজাল। পাচিনো পরে বলেছেন, জনকে প্রথম দেখেই তার মনে হয়েছিল, মানুষটা ভীষণ আকর্ষণীয়। ১৯৬৮ সালে ইজরায়েল হরোভিৎজের দ্য ইন্ডিয়ান ওয়ান্টস দ্য ব্রংক্স নাটকে দুজনে মঞ্চে উঠলেন একসঙ্গে, আর দুজনেই পেলেন অফ-ব্রডওয়ের পুরস্কার ওবি। ওই নাটক থেকে যে বন্ধুত্বের শুরু, তা টিকেছিল আমৃত্যু।
গডফাদারে মাইকেলের মেজো ভাই ফ্রেদোর চরিত্রে অডিশন দিতে কাজাল এসেছিলেন, শোনা যায়, পাচিনোর ডাকেই। বছর তিনেক পর সিডনি লুমেট যখন ডগ ডে আফটারনুন বানালেন, তখন ব্যাংক ডাকাতের সঙ্গী সালের চরিত্রে ঊনচল্লিশ বছরের কাজালকে অডিশনে ডাকতে লুমেটকে রাজি করালেন পাচিনোই। ওই সিনেমায় ব্যাংক ডাকাত সনি ওয়ার্টজিকের চরিত্রে অভিনয় করলেন পাচিনো নিজে, আর মায়ের ডাকা নামটা এভাবে পর্দায় ফিরে এলো অন্য এক মানুষের গায়ে।
পাচিনো কাজালকে বলতেন নিজের অভিনয়ের সঙ্গী। পর্দায় দুজনের সবচেয়ে মনে রাখার মতো দৃশ্যগুলো অবশ্য তৈরি হয়েছে দুই ভাইয়ের ভাঙন নিয়ে। প্রথম গডফাদারেই মাইকেল ফ্রেদোকে বলে, তুমি আমার বড় ভাই, আমি তোমাকে ভালোবাসি। পরের সিনেমায়, পার্ট টু-তে, বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে ওই ভাইকেই সে মেরে ফেলার আদেশ দেয়। আমার কাছে মনে হয়, ওই দৃশ্যগুলোর ঠান্ডা ভাব পাচিনো একা তৈরি করেননি। ফ্রেদোর চোখে যে আহত ভাব কাজাল ধরে রাখতেন, তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়েছিল বলেই মাইকেলের নীরবতা অতটা ভারী হতে পেরেছে। পাচিনো নিজেও বলেছেন, অভিনয় নিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি শিখেছেন জনের কাছে।
১৯৭৮ সালের মার্চে বেয়াল্লিশ বছর বয়সে ফুসফুসের ক্যানসারে মারা গেলেন জন কাজাল। পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তিনি করেছিলেন মোটে পাঁচটা, আর পাঁচটাই সেরা সিনেমার অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিল, যদিও নিজে একবারও মনোনয়ন পাননি। পর্দায় দুই বন্ধুর শেষ কাজ ছিল ডগ ডে আফটারনুন। গডফাদারের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে, ২০২২ সালে, পাচিনো কাজালকে বলেছিলেন তাদের সময়ের, এমনকি যেকোনো সময়ের, সেরা অভিনেতাদের একজন।
২০০৯ সালে কাজালকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি হলো, নাম আই নিউ ইট ওয়াজ ইউ। নামটা নেওয়া হয়েছে গডফাদার পার্ট টু-র সেই লাইন থেকে, যেখানে মাইকেল ফ্রেদোকে জানিয়ে দেয়, বিশ্বাসঘাতক যে ফ্রেদোই, সেটা সে জানে। পর্দায় যে কথা ছিল অভিযোগ, ডকুমেন্টারির শিরোনামে এসে সেটাই হয়ে উঠলো চিনে নেওয়ার কথা। ওই ডকুমেন্টারিতে বন্ধুকে নিয়ে কথা বলতে বসেছিলেন পাচিনোও।
সত্তরের দশক, অর্থাৎ কাজালের সঙ্গে কাজের ওই বছরগুলো, পাচিনোর নিজের জন্যও সহজ ছিল না। খ্যাতি সামলানোর মতো প্রস্তুতি তার ছিল না, আর বসার ঘরে মদের লুকানো বোতল খোঁজার অভিনয় করা সেই ছেলেই তখন নিজে ডুবে ছিলেন মদে। পরে তিনি বলেছেন, ওই দশকের বেশিরভাগ তার মনে নেই। তাকে টেনে তুলেছিলেন পুরোনো শিক্ষক চার্লি লটন। লটন তাকে থামতে বলেননি, শুধু খেয়াল রাখতে বলেছিলেন যে তিনি আসলে খাচ্ছেন। বছরখানেক পর পাচিনো মদ ছেড়ে দিলেন, আর লটনের ওই কথাকে পরে বললেন জীবন বাঁচানো কথা। লটন মারা যান ২০১৩ সালে, আর সনি বয়ের উৎসর্গপত্রে মায়ের নামের সঙ্গে আছে তার নামও।
একদিন লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রায় হঠাৎই এক হলে ঢুকে পড়েছিলেন পাচিনো। পর্দায় চলছিল ১৯৩২ সালের স্কারফেস, হাওয়ার্ড হকসের বানানো, পল মুনি অভিনীত। মায়ের হাত ধরে হলের অন্ধকারে সিনেমা চিনেছিলেন পাচিনো, আর বড় হয়ে আবার একটা হলের অন্ধকারেই খুঁজে পেলেন নিজের সবচেয়ে বেপরোয়া চরিত্র। মুনির অভিনয় দেখে তিনি এতটাই মজে গিয়েছিলেন যে পরে বলেছেন, তখন তার মনে হয়েছিল, আমি পল মুনি হতে চাই, ওভাবে অভিনয় করতে চাই। হল থেকে বেরিয়েই তিনি ফোন করলেন পুরোনো ম্যানেজার আর প্রযোজক মার্টি ব্রেগম্যানকে, যার সঙ্গে তখন কিছুদিন তার কথাবার্তা বন্ধ ছিল।
চিত্রনাট্য লিখলেন অলিভার স্টোন, আর গল্পটা মদ নিষিদ্ধের যুগের শিকাগো থেকে তুলে আনা হলো আশির দশকের কোকেনের মায়ামিতে। টনি মন্টানা কিউবা থেকে শরণার্থী হয়ে আমেরিকায় নামে খালি পকেটে, তারপর রাস্তার নিয়মে লড়ে লড়ে উঠে যায় কোকেন সাম্রাজ্যের চূড়ায়। টনির মতোই এক দ্বীপ থেকে শিশু বয়সে আমেরিকায় এসেছিলেন নানা জেমস, আর টনির মতোই রাস্তায় বড় হয়েছিল ক্লিফি, ব্রুস আর পিটি।
পরে চলচ্চিত্র সমালোচক গ্লেন কেনি লিখেছেন, সেটে পাচিনোকে শেখাতে হয়নি প্রায় কিছুই, বরং মাঝে মাঝে লাগাম টানতে হয়েছে। শেষ দৃশ্যের গোলাগুলির শুটিংয়ে সদ্য গুলি ছোড়া বন্দুকের গরম নল চেপে ধরেছিলেন তিনি, আর হাতটা নলের সঙ্গে আটকে গিয়েছিল। হাসপাতালে গিয়ে পোড়া হাত ব্যান্ডেজ করাতে হলো, আর শুটিং বন্ধ থাকলো দুই সপ্তাহ।
১৯৮৩ সালে মুক্তির পর স্কারফেসের রিভিউ এলো মিশ্র, আর সহিংসতা নিয়ে উঠলো তুমুল বিতর্ক। প্রিমিয়ারে মার্টিন স্করসেজি পাচিনোকে বলেছিলেন, হলিউড এই সিনেমা ঘৃণা করবে, কারণ সিনেমাটা ওদেরকে নিয়েই। দর্শক অবশ্য সময় নিয়ে সিনেমাটা বুঝে নিলো। কলেজ হোস্টেলের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলতে লাগলো টনি মন্টানার পোস্টার, আর ভিডিও ক্যাসেটে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেলো স্কারফেস। টনিকে সবচেয়ে আপন করে নিলো হিপহপ। হিউস্টনের র্যাপার ব্র্যাড জর্ডান সিনেমাটা দেখে নিজের নামই বদলে রাখলেন স্কারফেস। পাচিনো পরে বলেছেন, হিপহপ সিনেমাটা ধরতে পেরেছিল, বুঝতে পেরেছিল। যে ব্রংক্সের ছাদে পাচিনোর ছেলেবেলা কেটেছে, সত্তরের দশকে হিপহপের জন্মও হয়েছিল সেই ব্রংক্সের পাড়ায়, আর এভাবে পাচিনোর ফুটিয়ে তোলা টনি ঘুরে ফিরে এলো ব্রংক্সেরই গানে।
অস্কার অবশ্য পাচিনোকে এনে দিয়েছিল সেন্ট অব আ উইম্যান। তবু গ্লেন কেনি লিখেছেন, পাচিনো কোনো অনুষ্ঠানে নিজের সিনেমার দৃশ্য দেখালে হাততালি বেশি পড়ে স্কারফেসের দৃশ্যেই। দুই স্কারফেসেই ফিরে ফিরে আসে একটা বাক্য, দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ইয়োরস, পৃথিবী তোমার। শেষ দৃশ্যে টনি গুলি খেয়ে পড়ে যায় নিজের প্রাসাদের ভেতর, ওই বাক্য লেখা গ্লোবের নিচে।
পাঁচ বছর বয়সে পাচিনোর সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র ছিল এক মাতাল, আর তেতাল্লিশে যে চরিত্র তাকে পৌঁছে দিলো পৃথিবীর ঘরে ঘরে, সে এক মাদকসম্রাট। মাঝখানের আটত্রিশ বছরে বসার ঘরের ছবিটা উল্টে গেছে। আজও ঢাকা থেকে ব্রংক্স, অগুনতি ঘরে কিশোরেরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টনি মন্টানার গলায় কথা বলে কাল্পনিক বন্দুক তুলে ধরে, আর ঘরের বড়রা হাসে। ওই কিশোরদের কেউ কেউ হয়তো হাসি শুনেও থামে না, শুধু মনে মনে ভাবে, ওরা হাসছে কেন?
আমি